পলাশ পাল, নেত্রকোনা জেলা প্রতিনিধি
শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠজুড়ে কাশফুলের দোলা আর শিউলির সুবাস—প্রকৃতিতে এখন উৎসবের আমেজ। এরই মধ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায়ও শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। উপজেলার ৫৫টি পূজামণ্ডপে চলছে সাজসজ্জা ও আনুষঙ্গিক কাজ। আর মাটির প্রতিমায় রংতুলির শেষ আঁচড় দিতে দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা।
মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়েছে। এরপর থেকেই দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষায় রয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের পর সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে উৎসব।
সরেজমিনে বারহাট্টা উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, কোথাও প্যান্ডেল নির্মাণ ও আলোকসজ্জার কাজ চলছে, কোথাও চলছে মণ্ডপের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। পাশাপাশি প্রতিমাশিল্পীদের ব্যস্ততাও বেড়েছে কয়েক গুণ। খড়, বাঁশ ও মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ শেষ করে এখন চলছে রং ও সাজসজ্জার শেষ ধাপ।
মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে রূপ পাচ্ছেন দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুর। প্রতিমার চোখ, মুখাবয়ব, পোশাক ও অলংকারে সূক্ষ্ম কারুকাজ ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত কারিগরেরা। পূজা শুরুর সময় ঘনিয়ে আসায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করছেন তারা।
প্রতিমাশিল্পীরা জানান, প্রতিমা তৈরির সঙ্গে তাদের শুধু জীবিকা নয়, ধর্মীয় অনুভূতি, ভক্তি ও ভালোবাসাও জড়িয়ে রয়েছে। পরিবারের সদস্য ও সহকারী কারিগরদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তারা এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তবে বাঁশ, খড়, মাটি, রং ও অন্যান্য উপকরণের দাম বেড়েছে। সেই তুলনায় প্রতিমার দাম তেমন বাড়েনি। এতে পরিশ্রমের তুলনায় আয় কমে গেলেও বংশপরম্পরায় চলে আসা এ পেশাকে তারা আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে ধরে রেখেছেন।
তাদের ভাষ্য, সময়ের সঙ্গে প্রতিমার গড়ন ও সাজসজ্জায়ও পরিবর্তন এসেছে। আগে কাপড়, বিভিন্ন ধরনের অলংকার ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে প্রতিমা সাজানো হলেও এসবের দাম বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে মাটির তৈরি সাজসজ্জার ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে ভক্তদের চাহিদা ও রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিমার নকশায়ও নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন তারা।
বারহাট্টা উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক প্রদীপ সরকার শ্যামল বলেন, এবার উপজেলায় ৫৫টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। পূজাকে ঘিরে এরই মধ্যে উপজেলাজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপের সার্বিক প্রস্তুতির খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করেন তিনি।
বারহাট্টা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চম্পক দাম বলেন, দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণভাবে পালনের লক্ষ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং পূজা কমিটির সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পূজার সময় প্রতিটি মণ্ডপে নজরদারি ও পুলিশের টহল জোরদার থাকবে।
এদিকে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বারহাট্টার বিভিন্ন এলাকায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন পোশাক কেনা, পূজার বাজার ও মণ্ডপসজ্জাকে ঘিরে ব্যস্ততা বাড়ছে। শেষ মুহূর্তে প্রতিমা ও মণ্ডপের সাজসজ্জার কাজ শেষ করে উৎসবকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত হচ্ছেন আয়োজক ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।