মো. এরশাদ আলী, লংগদু (রাঙামাটি) প্রতিনিধি
পাহাড় ও কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত রাঙামাটির দুর্গম উপজেলা লংগদু। যোগাযোগ সংকট, সীমিত নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামোগত নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল এ উপজেলার মানুষ। তবে গত এক বছরে উপজেলা প্রশাসনের কয়েকটি জনমুখী উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর হোসাইনের নেতৃত্বে নেওয়া এসব উদ্যোগ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক আলোচনা তৈরি হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ও হ্রদবেষ্টিত বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে মানুষের সমস্যা শুনছেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তা সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
উপজেলা প্রশাসনের অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে শিশুদের বিনোদন, মানসিক বিকাশ ও অবসর কাটানোর সুযোগ তৈরি করতে নির্মাণ করা হয়েছে ‘শিশু অবকাশ’ কেন্দ্র। স্থানীয় অভিভাবকদের মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশ তৈরিতে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
নাগরিক সেবা সম্প্রসারণেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। দুর্গম শিলাছড়া এলাকায় বসবাসকারী অনেক মানুষের জন্মনিবন্ধন না থাকায় তারা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুর্গম এলাকায় সরাসরি গিয়ে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে নতুন পরিকল্পনা। ভূমি অধিগ্রহণের পরিবর্তে মাইনীমুখ বাজারসংলগ্ন ভরাটকৃত খাসজমিতে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় তরুণদের ক্রীড়া চর্চার সুযোগ বাড়বে।
এ ছাড়া কাপ্তাই হ্রদের ঢেউয়ে ভাঙনপ্রবণ এলাকায় গাইড ওয়াল নির্মাণ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ এবং কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা বিতরণেও উপজেলা প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
রাজস্ব আহরণেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, লংগদু ফেরিঘাট ইজারা থেকে অতীতে সর্বোচ্চ প্রায় ৮ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হলেও চলতি অর্থবছরে ইজারা বাবদ আদায় হয়েছে ২৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫০০ টাকা। অতিরিক্ত রাজস্বের অর্থ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফেরিঘাটগুলোতে যাত্রী ছাউনি নির্মাণসহ জনসেবামূলক বিভিন্ন কাজে ব্যয় করা হচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধে উদ্যোগ, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও আস্থা বেড়েছে। তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের সক্রিয় উপস্থিতির কারণে বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইউএনও জাহাঙ্গীর হোসাইন বলেন, “সরকারি সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুফল যাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায়, সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। লংগদুর ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। সবার সহযোগিতা পেলে লংগদুকে একটি আধুনিক, সুশাসনভিত্তিক ও উন্নত উপজেলায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে।”