অনলাইন ডেক্স:
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তদন্তে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি নেটওয়ার্কের তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা হারুন অর রশিদের নামও উঠে এসেছে। তার বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
অভিযোগ ওঠার পর গত কয়েক দিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন হারুন অর রশিদ। তার মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানা গেছে। গত ১৮ অক্টোবর সকালে সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের হোসেনপুর দক্ষিণ এলাকায় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ১৫ অক্টোবর সর্বশেষ তিনি কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। এরপর দাপ্তরিক প্রয়োজনে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
হারুন অর রশিদ ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তা। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে যোগ দেন। এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
যুব উন্নয়নের পরীক্ষা স্থগিত
গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য যোগ্য বিবেচিত হন ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন চাকরিপ্রার্থী।
নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ঢাকার ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন। পরে মামলার নথিপত্র পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ১৬ অক্টোবর নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তদন্তে ১১ নিয়োগ পরীক্ষার তথ্য
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য পেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথন এবং বার্তা পর্যালোচনা করে অন্তত ১১টি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
তদন্তে যেসব নিয়োগ পরীক্ষার নাম এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা, হিসাব সহকারী, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, উপ-খাদ্য পরিদর্শক, খাদ্য মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, অডিটর, কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ), পরিবেশ অধিদপ্তর, নির্বাচন কমিশন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং রাজশাহী পোস্টাল অপারেটর ও মেইল অপারেটর পদে নিয়োগ পরীক্ষা।
বহুস্তরে ভাগ করা ছিল নেটওয়ার্ক
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশ্নফাঁসের এই নেটওয়ার্ক একক কোনো ব্যক্তি বা দপ্তরকেন্দ্রিক ছিল না। এতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ একাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন স্তরে কাজ করতেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
কেউ প্রশ্ন সংগ্রহ ও সরবরাহের দায়িত্বে, কেউ পরীক্ষার্থী সংগ্রহ, কেউ উত্তর তৈরি ও বিতরণ এবং কেউ মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে প্রশ্নফাঁসের কার্যক্রম ছিল কয়েকটি স্তরে বিভক্ত।
তদন্তে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সুজিত গোপকে নেটওয়ার্কের অন্যতম সমন্বয়কারী হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করার অভিযোগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী আসাদুল হাবিব, একটি ট্যাক্স ফার্মের কর্মচারী নূর মোহাম্মদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিম্নমান সহকারী বা পেশকার জাহাঙ্গীর আলম এবং এস এম এমদাদুল রহমানের নামও তদন্তে এসেছে।
মতিঝিল এলাকায় পরীক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নের উত্তর পৌঁছে দেওয়ার কাজে এমদাদুলের ভূমিকা ছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে মতিঝিলের একটি কক্ষে ১৫ জন পরীক্ষার্থীকে প্রশ্নের উত্তর পড়ানো হয়েছিল বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রেফতার সাতজন
তদন্তে মফিজুল ইসলাম ওরফে রাফি, হাসিনুর রহমান সুজন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোহাম্মদ রুবেল ইসলামের নামও এসেছে। এ ঘটনায় মোট সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রুবেল ইসলাম ২০২০ সালের আগে কম্পিউটার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনলাইনে ফরম পূরণ, ডাউনলোড, প্রিন্টিং ও টাইপিংয়ের কাজ করতে গিয়ে পরবর্তীতে তিনি প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে নেটওয়ার্কের আরও ওপরের স্তরে থাকা ব্যক্তিদের এখনো গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।
হারুন-সোহাগের যোগাযোগের অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, নেটওয়ার্কের একটি পর্যায়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সহকারী পরিচালক (সংস্থাপন) সোহাগ ফকিরের নাম এসেছে। তার কাছ থেকে প্রশ্ন সিরাজগঞ্জের জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদের কাছে যেত বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই স্তরে হারুন ও সোহাগ ছাড়াও আরও কয়েকজন কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে বিসিএসআইআরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর কাজল আহমেদ, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির সহকারী পরিচালক রাফিউল ইসলাম এবং ভরতখালী উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক হরি প্রসাদ রায়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, হারুন ও সোহাগের মধ্যে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। তারা দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
১০ লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে চাকরি দেওয়ার কথা বলে সম্ভাব্য চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লিখিত চুক্তি করার অভিযোগও রয়েছে।
চুক্তির বিপরীতে প্রার্থীদের কাছ থেকে মূল শিক্ষাগত সনদ রাখা হতো বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। যারা একসঙ্গে টাকা দিতে পারতেন না, তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর করা ব্যাংক চেক নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি হারুনের
সিরাজগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হারুন অর রশিদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার কার্যালয়ে গিয়ে তার অনুপস্থিতির বিষয়টি জানা যায়।
তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা, তদন্ত কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধান চলছে। তদন্ত শেষ হলে নেটওয়ার্কটির সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা—সে বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।