ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে একটু নিরাপদ আশ্রয়, মাথা গোঁজার একটি স্থায়ী ঠিকানা এবং শান্তিতে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। কিন্তু সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের উত্তর পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধা মোনজাহান বেগম ও তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে মোমেনা খাতুনের জীবনে সেই স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। চরম দারিদ্র্য, শারীরিক অসুস্থতা ও সামাজিক অসহায়ত্বের কারণে তাঁরা বছরের পর বছর ধরে একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জীবনের শেষ বয়সে এসে তাঁদের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা—একটি নিরাপদ পাকা ঘর।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃদ্ধা মোনজাহান বেগম বর্তমানে তাঁর মামাতো ভাই আশরাফ আলীর বাড়ির পেছনে নির্মিত একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে মেয়ে মোমেনা খাতুনকে নিয়ে বসবাস করছেন। বাঁশ, টিন ও পলিথিন দিয়ে তৈরি এই অস্থায়ী ঘরটি বর্ষা মৌসুমে প্রায়ই বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায়। সামান্য ঝড়-বৃষ্টি হলেই তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। কারণ, যেকোনো সময় ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে এই মা-মেয়ে নানা কষ্ট ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে আসছেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মোনজাহান বেগম বর্তমানে ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগলেও অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে পারেন না তিনি। অন্যদিকে তাঁর মেয়ে মোমেনা খাতুন শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে সক্ষম নন। ফলে তাঁদের সংসারে উপার্জনের কোনো স্থায়ী উৎস নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঝুপড়ি ঘরটির ভেতরে নেই কোনো প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। একটি পুরোনো খাট, কয়েকটি ব্যবহৃত থালা-বাসন এবং কিছু ছেঁড়া কাপড় নিয়েই তাঁদের পুরো সংসার। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাও তাঁদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয়দের সহযোগিতা ও মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করেই কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।
কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোনজাহান বেগম। তিনি বলেন, “বয়স হয়েছে, শরীর আর চলে না। মেয়েটাও প্রতিবন্ধী। নিজের বলতে কিছুই নেই। থাকার মতো ভালো ঘর নেই। অনেক কষ্ট করে দিন পার করছি। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি পড়ে, রাতে ঘুমাতে পারি না। আল্লাহ ছাড়া আমাদের দেখার কেউ নেই। জীবনের শেষ সময়ে একটা পাকা ঘরে থাকতে পারলে শান্তি পেতাম।”
মোমেনা খাতুনও অসহায় কণ্ঠে বলেন, “আমরা খুব কষ্টে আছি। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। মা অসুস্থ, আমিও কাজ করতে পারি না। যদি কেউ আমাদের একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে বাকি জীবনটা একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।”
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী হৃদয় আহমেদ বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে এই মা-মেয়ের কষ্টের জীবন দেখছি। তাঁদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁদের জন্য একটি নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে তাঁদের জীবন বদলে যেতে পারে।”
এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন জানান, “আমরা অনেক বছর ধরে তাঁদের এভাবেই কষ্ট করে বেঁচে থাকতে দেখছি। বয়সের কারণে বৃদ্ধা নারীটি এখন আর ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। মেয়েটিও প্রতিবন্ধী। তাঁদের জন্য একটি সরকারি ঘর বা অন্য কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সমাজের সবাই যদি একটু করে সাহায্য করেন, তাহলে তাঁদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, সমাজের সবচেয়ে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। বিশেষ করে অসহায় বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও আশ্রয়হীন ব্যক্তিদের জন্য সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও অনেক সময় প্রকৃত উপকারভোগীরা নানা কারণে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।
এ বিষয়ে রায়গঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়-এর সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসাইন শেখ বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব। তাঁরা যদি সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও সমাজের একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ের কিছু মানুষ এখনো ন্যূনতম আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। মোনজাহান বেগম ও তাঁর প্রতিবন্ধী মেয়ে মোমেনা খাতুনের জীবনসংগ্রাম তারই একটি বাস্তব উদাহরণ। জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের চাওয়া খুব বেশি নয়—শুধু একটি নিরাপদ পাকা ঘর, যেখানে নিশ্চিন্তে মাথা গুঁজে বাকি জীবনটা কাটাতে পারবেন।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলো এই অসহায় মা-মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাঁদের জীবনের শেষ প্রান্তের এই ছোট্ট স্বপ্নটি পূরণ হলে হয়তো মানবতার জয়গানই আরও একবার উচ্চারিত হবে।