হৃদয় রায়হান, নিজস্ব প্রতিনিধি:
জীবনের প্রায় ৪৫ বছর পথে-ঘাটে, বাজারে ও রেলস্টেশনে কাটানোর পর অবশেষে স্বজনদের কাছে ফিরলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের ইসাক মিয়া (প্রায় ৭০)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওর সূত্র ধরে তাঁর স্বজনরা সন্ধান পান এবং মঙ্গলবার (২ জুন) কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশন থেকে তাঁকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যান।
জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাদু মিয়ার ছোট ছেলে ইসাক মিয়া সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট। আশির দশকে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি পরিবারের দুই বিঘা কৃষিজমি ও ৪০ শতাংশ বসতভিটাসহ সম্পত্তি প্রায় ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। পরে সেই টাকা নিয়ে সিলেটে যান বিদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে এক প্রতারক দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারান। বিদেশ যাওয়া তো দূরের কথা, নিজের বাড়িতেও আর ফেরা হয়নি তাঁর।
এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ ভাসমান জীবন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে জীবনের প্রায় ৪৫ বছর কেটে যায়। বয়সের ভার, শারীরিক অসুস্থতা ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার কারণে তিনি সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে আশ্রয় নেন। স্থানীয়রা তাঁকে অসহায় অবস্থায় দেখতে পেয়ে চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করেন।
প্রায় ২৬ দিন আগে স্টেশন এলাকায় অচেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন ইসাক মিয়া। স্থানীয় ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রথমে সবাই তাঁকে মৃত ভেবেছিলেন। পরে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হলে ধীরে ধীরে তিনি কথা বলতে শুরু করেন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি নিজের গ্রামের নাম এবং আত্মীয়-স্বজনদের পরিচয় জানান।
পরবর্তীতে স্থানীয় সাংবাদিক ও একটি গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে ইসাক মিয়াকে নিয়ে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাঁর স্বজনদের নজরে আসে। ভিডিওতে ইসাক মিয়া নিজের গ্রামের নাম ও পরিবারের সদস্যদের পরিচয় বলছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর তাঁর ভাগনে বাচ্চু মিয়া (৬০) ও মো. সাজাহান মিয়া (৬৫), ভাতিজা তাহের মিয়াসহ কয়েকজন স্বজন কুমারখালীতে ছুটে আসেন।
মঙ্গলবার দুপুরে কুমারখালী রেলস্টেশনের বিশ্রামাগারে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের সামনে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইসাক মিয়া। অযত্ন আর বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই বৃদ্ধ কখনো চেয়ারে বসছিলেন, কখনো আবার মেঝেতে শুয়ে পড়ছিলেন। তাঁকে ঘিরে স্বজন ও স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দ ও আবেগের মিশ্র অনুভূতি দেখা যায়।
ইসাক মিয়ার ভাগনে বাচ্চু মিয়া জানান, প্রায় ৪৫ বছর আগে বিদেশ যাওয়ার জন্য পরিবারের সবাই মিলে সম্পত্তি বিক্রি করেছিলেন। এরপর ইসাক মিয়া বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। দীর্ঘদিন খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ইসাক মিয়া ছাড়া তাঁদের পরিবারের অন্য কোনো ভাই-বোন জীবিত নেই।
আরেক ভাগনে সাজাহান মিয়া বলেন, “সপ্তাহখানেক আগে ফেসবুকে একটি ভিডিওতে মামাকে দেখতে পাই। পরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হই যে তিনিই আমাদের হারিয়ে যাওয়া মামা। তাঁকে নিতে আজ এখানে এসেছি। তাঁর বাড়িতে এখন কেউ নেই। আমরা তাঁর চিকিৎসা ও দেখভালের দায়িত্ব নেব।”
ভাতিজা তাহের মিয়া বলেন, “বাবার মুখে চাচার অনেক গল্প শুনেছি। কখনো ভাবিনি তাঁকে ফিরে পাব। ফেসবুক ও গণমাধ্যমের কারণে আজ চাচাকে ফিরে পেলাম।”
স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে পেরে খুশি ইসাক মিয়াও। ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিদেশ যাওনের লাইগা জাগাজমি বেইচা সিলেট গেছিলাম। দালাল সব টেহা মাইরা দিছে। তারপর পাগলের মতো ঘুরছি। আজ ভাগনে নিতে আইছে, বাড়ি যামু। ভালো লাগতাছে।”
পরে কুমারখালী উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচয় ও স্বজনদের তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে ইসাক মিয়াকে তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, “গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে প্রায় ৪৫ বছর পর ইসাক মিয়া তাঁর স্বজনদের কাছে ফিরতে পেরেছেন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাঁকে তাঁর ভাগনে ও স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময়ের বিচ্ছেদের পর ইসাক মিয়ার এই ফিরে আসার ঘটনা এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকার একটি মানবিক উদাহরণ হিসেবে ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসিত হচ্ছে।