শিরোনাম
ময়মনসিংহ জেলা মাসিক রাজস্ব সভায় শ্রেষ্ঠ এসিল্যান্ড হিসেবে সম্মাননা পেলেন সৈয়দা তামান্না হোরায়রা ভাঙ্গুড়ায় রাস্তার পাশের গাছ বিক্রির অভিযোগ, তদন্তে বন বিভাগ ভাঙ্গুড়ায় প্রিজম প্রি-ক্যাডেট অ্যান্ড হাইস্কুলে ২ হাজার গাছের চারা বিতরণ সীতাকুণ্ডে কিশোরের মৃত্যুর জেরে গণপিটুনিতে নিহত চিহ্নিত মাদক কারবারি, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ সিংড়ায় হিলফুল ফুজুল বাংলাদেশের উদ্যোগে দিনব্যাপী নৌকা ভ্রমণ অনুষ্ঠিত দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন সান্তাহারে ট্রাক্টর, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান চালক শ্রমিক ইউনিয়নের জরুরি সভা অনুষ্ঠিত নেত্রকোনায় নিজ ঘরে যুবককে গলা কেটে হত্যা কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন মিজ সানজিদা চৌধুরী খাগড়াছড়িতে পিসিএনপির মতবিনিময় সভা, সংগঠনকে ‘ফ্যাসিস্টমুক্ত’ করার দাবি চেয়ারম্যান হামিদ রানার
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০২:০৩ পূর্বাহ্ন

পদ্মা ব্যারাজ: উন্নয়নের স্বপ্ন নাকি নতুন পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা? দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট সমাধানে সরকারের বড় প্রকল্প ঘিরে তুমুল বিতর্ক

প্রতিবেদকের নাম / ৪২ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

 

অনলাইন ডেক্স:

পদ্মা নদীর ওপর বহুল আলোচিত ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণকে কেন্দ্র করে দেশে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকার বলছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে, কৃষি ও সেচব্যবস্থায় আসবে বিপ্লব, কমবে লবণাক্ততা এবং উপকৃত হবে কোটি মানুষ। তবে পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও ভূতত্ত্ববিদদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, ভুল পরিকল্পনায় নির্মিত এই ব্যারাজ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নদী, পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি করতে পারে।

গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের কার্যনির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের অনুমোদন দেন। দীর্ঘদিন ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এটিকে ‘গঙ্গা ব্যারাজ’ নামে অভিহিত করে আসছিল। কারণ, বাংলাদেশে প্রবেশের পর গঙ্গা নদী পদ্মা নামে পরিচিত হলেও গোয়ালন্দ পর্যন্ত অংশটিকে অনেক বিশেষজ্ঞ গঙ্গার মূলধারা হিসেবেই বিবেচনা করেন।

কী এই পদ্মা ব্যারাজ?

সহজ ভাষায় ব্যারাজ হলো এমন একটি অবকাঠামো, যেখানে গেট বা কপাটের মাধ্যমে নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মাণাধীন পদ্মা ব্যারাজের দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার। এতে থাকবে—

৭৮টি স্পিলওয়ে বা পানিনিষ্কাশন কপাট

১৮টি আন্ডার স্লুইস

মাছ চলাচলের জন্য ২টি ফিশ পাস

প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। ২০২৬ থেকে ২০৩৩ সালের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারাজের গেট বন্ধ করে পানখা থেকে পাংশা পর্যন্ত নদীপথে প্রায় ১২ মিটার উচ্চতায় পানি ধরে রাখা হবে। সরকারের দাবি, এতে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

সরকারের দাবি: বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলা এবং রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ উপকৃত হবে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী—

শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজে সংরক্ষিত পানি গড়াই-মধুমতী, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীতে প্রবাহিত করা হবে

প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে

বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৪ লাখ টন ধান উৎপাদন হতে পারে

খুলনা, যশোর ও সুন্দরবন অঞ্চলে লবণাক্ততা কমবে

জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের উন্নয়ন হবে

মাছের উৎপাদন প্রায় আড়াই লাখ টন বাড়তে পারে

ব্যারাজ ও গড়াইয়ের মুখে টারবাইন বসিয়ে ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে

পাউবোর হিসাব অনুযায়ী, সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

কেন উঠছে বিরোধিতা?

বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মা ব্যারাজের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক পলি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া।

ভূতত্ত্ববিদ ড. আহাদ চৌধুরী বলেন, নদীর পলি আটকে গেলে বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদে অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদীর উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে বাঁধের কারণে পলি প্রবাহ কমে যাওয়ায় উপকূলীয় ভূমি দ্রুত সাগরে বিলীন হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে—

বাংলাদেশের গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ টিকে থাকতে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টন পলি প্রয়োজন

বর্তমানে গঙ্গা নদী বছরে প্রায় ৪০–৬০ কোটি টন পলি বাংলাদেশে নিয়ে আসে

ব্যারাজের গেট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এই পলি উজানেই আটকে যাবে

ফলে ভাটির দিকে প্রবাহিত পানি হয়ে উঠবে ‘পলিশূন্য ক্ষুধার্ত পানি’, যা নদীর পাড় ভাঙনকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।

বাড়তে পারে লবণাক্ততা ও বন্যা

পানি বিশেষজ্ঞ ড. মো. খালেকুজ্জামান সতর্ক করে বলেন, মেঘনা মোহনায় মিঠাপানির চাপ কমে গেলে সমুদ্রের নোনা পানি আরও গভীরে প্রবেশ করতে পারে। এতে দক্ষিণাঞ্চল তো বটেই, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা—

ব্যারাজের পেছনে দ্রুত পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হবে

পাংশা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে

ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি বাড়বে

তারা বলছেন, ভারতের ফারাক্কা বাঁধের উজানে বিহার ও মালদা অঞ্চলে ইতোমধ্যে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সেচ ও বিদ্যুৎ নিয়ে প্রশ্ন

সমালোচকদের মতে, প্রকল্পে যে পরিমাণ সেচের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে সেই পরিমাণ পানি ব্যারাজে জমা রাখা সম্ভব হবে না।

তাদের হিসাব অনুযায়ী—

২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দিতে প্রয়োজন ৯ দশমিক ৫ থেকে ২৬ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি

অথচ ব্যারাজে সংরক্ষণের পরিকল্পনা মাত্র প্রায় ৩ বিলিয়ন ঘনমিটার

অর্থাৎ প্রকল্পের দাবির সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের ফারাক রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি অধিকাংশ পানি সেচে ব্যবহার করা হয়, তাহলে নৌ-চলাচল ও মাছের জন্য পর্যাপ্ত পানি থাকবে না।

মাত্র ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পুরো পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যৌক্তিক কি না, সে প্রশ্নও তুলছেন তারা।

হুমকিতে ইলিশসহ দেশীয় মাছ

বিশেষজ্ঞদের অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে মাছের প্রজনন ও চলাচল। বিশেষ করে ইলিশসহ অনেক দেশীয় মাছ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল।

প্রকল্পে দুটি ফিশ পাস বা ফিশ ল্যাডার রাখার পরিকল্পনা থাকলেও বাংলাদেশের নদীর মাছ এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ফারাক্কার অভিজ্ঞতা কী বলছে?

পদ্মা ব্যারাজ বিতর্কের পেছনে বড় কারণ ভারতের ফারাক্কা বাঁধের অভিজ্ঞতা।

১৯৭৫ সালে ভারত সীমান্তের অদূরে গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে। এর ফলে বাংলাদেশে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি হয়, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে।

বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী—

১৯৯৭–২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৫২ শতাংশ সময় ন্যায্য হিস্যা পায়নি

চুক্তিতে কার্যকর গ্যারান্টি ক্লজ নেই

ফারাক্কার উজানে ব্যাপক পলি জমে নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে

প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে হাজারো পরিবার

বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত বিকল্প

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যারাজ নির্মাণের আগে বিদ্যমান নদী ব্যবস্থাপনার সমস্যাগুলো সমাধান জরুরি।

তাদের প্রস্তাব—

নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা

ভুল স্লুইসগেট, রেগুলেটর ও পোল্ডারের কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এগুলো সংস্কার বা অপসারণ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

নদী ড্রেজিং

গড়াই-মধুমতী ও হিসনা-মাথাভাঙ্গার মতো ভরাট নদীগুলো ড্রেজিং করে পুনরুজ্জীবিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি

২০২৬ সালে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারত ও নেপালকে নিয়ে অববাহিকাভিত্তিক নতুন চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এই চুক্তিতে থাকতে পারে—

শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা

পলির ন্যায্য বণ্টনের গ্যারান্টি

নেপালের কোশি অববাহিকায় যৌথ জলাধার নির্মাণ

‘সেডিমেন্ট বাইপাস টানেল’ প্রযুক্তি

যদি ব্যারাজ করতেই হয়, তবে জার্মানির রাইন নদী ও যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া নদীর আদলে ‘সেডিমেন্ট বাইপাস টানেল’ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন ড. আহাদ চৌধুরী।

এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্ষাকালে পলিযুক্ত পানি সরাসরি ভাটির দিকে চলে যাবে এবং ব্যারাজে শুধু পরিষ্কার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

উন্নয়ন নাকি নতুন ঝুঁকি?

পদ্মা ব্যারাজ এখন বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত মেগা প্রকল্প। একদিকে সরকার এটিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, যথাযথ গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ মূল্যায়ন ছাড়া এমন প্রকল্প ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে আন্তর্জাতিক মানের সমীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব বিশ্লেষণ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভস
24 May 2026

পদ্মা ব্যারাজ: উন্নয়নের স্বপ্ন নাকি নতুন পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা? দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট সমাধানে সরকারের বড় প্রকল্প ঘিরে তুমুল বিতর্ক

www.dainikkagoj.com
24 May 2026

পদ্মা ব্যারাজ: উন্নয়নের স্বপ্ন নাকি নতুন পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা? দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট সমাধানে সরকারের বড় প্রকল্প ঘিরে তুমুল বিতর্ক

www.dainikkagoj.com