কাগজ ডেস্ক:
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর সদ্য ঘোষিত চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি থেকে একযোগে ২২ জন নেতাকর্মীর পদত্যাগের ঘটনায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কমিটি ঘোষণার মাত্র একদিনের ব্যবধানেই এই গণপদত্যাগ দলীয় অভ্যন্তরীণ সংকটকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার (১৫ মে) সকালে পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন বর্তমান কমিটির দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ রাফসান জানি রিয়াজ। তিনি জানান, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে অন্তর্ভুক্তি এবং নৈতিক সঙ্কটের কারণে তারা সম্মিলিতভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) মীর মোহাম্মদ শোয়াইবকে আহ্বায়ক এবং আরিফ মঈনুদ্দীনকে সদস্যসচিব করে ১৬৮ সদস্যের চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পরপরই একের পর এক ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে।
পদত্যাগ করা নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, নবগঠিত কমিটিতে অনেক অযোগ্য ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। তাদের দাবি, এতে সংগঠনের ত্যাগী ও দীর্ঘদিনের কর্মীরা চরমভাবে অবমূল্যায়িত হয়েছেন।
তারা আরও অভিযোগ করেন, কিছু নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টাকার বিনিময়ে পদ বাণিজ্য, নারী কেলেঙ্কারি এবং মামলা বাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে সংগঠনের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তারা দাবি করেন।
পদত্যাগ করা দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ রাফসান জানি রিয়াজ বলেন,
“দলের জন্য যারা বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। আমরা এ কমিটির পুনর্মূল্যায়ন চাই। বিষয়টি আমরা কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জানাব।”
অন্যদিকে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ বলেন,
“আমরা আদর্শ, নৈতিকতা ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক চর্চার আশায় এনসিপিতে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু সাম্প্রতিক কমিটি গঠন ও কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ড আমাদের হতাশ করেছে। রাজনৈতিক সংগঠনে দুর্নীতি ও ব্যক্তিস্বার্থের কোনো জায়গা থাকতে পারে না।”
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতেও তারা জনস্বার্থ, ন্যায়বিচার এবং স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পক্ষে কাজ করে যাবেন।
এই গণপদত্যাগে যেসব নেতাকর্মী পদত্যাগ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
সৈয়দ এহছানুল হক (যুগ্ম আহ্বায়ক), কামরুল কায়েস (যুগ্ম আহ্বায়ক), মো. সোহরাব চৌধুরী (যুগ্ম সদস্যসচিব), হামিদুল ইসলাম (যুগ্ম সদস্যসচিব), বদিউল আলম (যুগ্ম সদস্যসচিব), মোহাম্মদ সরোয়ার আলম (যুগ্ম সদস্যসচিব), ইকবাল মাসুদ (যুগ্ম সদস্যসচিব), রকিবুল ইসলাম (সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক), ডা. মাহতাব উদ্দিন আহমদ (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), সাদমানুর রহমান চৌধুরী (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), সুফি মোহাম্মদ মিনহাজ (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), মোহাম্মদ কারিওল মাওলা (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), মোহাম্মদ আকরাম হোসেন (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), মোশাররফ হোসেন রবিন (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), নুরুল আবছার সাইবান (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), মোস্তফা রাশেদ আজগর (সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক), মোহাম্মদ রাফসান জানি রিয়াজ (দফতর সম্পাদক), মো. নুরুদ্দীন (সমাজকল্যাণ সম্পাদক), মোহাম্মদ বেলাল হোসেন (সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক), তাহজীব চৌধুরী (সদস্য) এবং মো. ওমর সাঈদ (সদস্য)।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ঘোষণার একদিনের মধ্যেই এত বড় সংখ্যক পদত্যাগ দলটির অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও নেতৃত্ব কাঠামোর দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করছে।
তারা মনে করছেন, যদি দ্রুত অভ্যন্তরীণ সংকট সমাধান না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সংগঠনের সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি থেকে ২২ নেতাকর্মীর একযোগে পদত্যাগ এনসিপির জন্য একটি বড় ধরনের সাংগঠনিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ, অসন্তোষ এবং নেতৃত্ব সংকট—সব মিলিয়ে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই রাজনৈতিক মহলের নজরকাড়া বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।