কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি:
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ক্রমেই পরিবেশগত সংকটের মুখে পড়ছে। আগামরা বা টপ-ডাইং রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে সুন্দরী গাছ। একই সঙ্গে কমছে নতুন চারা জন্মানোর হার। ফলে বনের প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম, জীববৈচিত্র্য ও কার্বন শোষণ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সর্বশেষ এক গবেষণায় উঠে এসেছে, সুন্দরবনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত। গত তিন দশকে বনের কার্বন শোষণ ক্ষমতাও কমেছে ১৫ শতাংশ।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে আক্রান্ত সুন্দরী গাছের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। এসব গাছের পাতা, ডালপালা ও মূলকাণ্ড পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোগের বিস্তার অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ সুন্দরীর অস্তিত্ব ও বনের স্বাভাবিক গঠন আরও পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাড়ছে আক্রান্ত গাছ, কমছে সুস্থ সুন্দরী
সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৃক্ষ সুন্দরী। একসময় বনের বিস্তীর্ণ এলাকায় এ গাছের আধিপত্য ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আগামরা রোগের বিস্তার সুন্দরী গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় ১৯৮৬ সালের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গুরুতরভাবে আক্রান্ত সুন্দরী গাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সে সময় গুরুতর আক্রান্ত গাছের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ। ৩৬ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ২ কোটি ২ লাখে দাঁড়িয়েছে।
শুধু পূর্ণবয়স্ক গাছের মৃত্যুই নয়, নতুন চারা জন্মানোর হার কমে যাওয়াও সুন্দরবনের জন্য উদ্বেগজনক। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৬ সালে প্রতি হেক্টরে সুন্দরী গাছের চারার ঘনত্ব ছিল ২ হাজার ৬৮৯টি। পরবর্তী সময়ে তা কমে ৭৬টিতে নেমে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্মের সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
লবণাক্ততা ও মিঠাপানির সংকটে বাড়ছে রোগের ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরী গাছে আগামরা রোগের বিস্তারের পেছনে একাধিক পরিবেশগত কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পলি জমার পরিবর্তিত ধারা।
বিশেষ করে উচ্চ ও মাঝারি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় সুন্দরী গাছে রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যাচ্ছে। পরিবেশের এমন পরিবর্তন গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, পুষ্টি গ্রহণ ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ছে সুন্দরবনের বৃক্ষবৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের ওপর।
সুন্দরবনের নদী-খাল, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ এবং মিঠাপানি ও লবণাক্ত পানির ভারসাম্য এই বনের পরিবেশগত স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটলে সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের বিস্তার ও টিকে থাকার সক্ষমতাও প্রভাবিত হতে পারে।
কার্বন শোষণ কমায় বাড়ছে জলবায়ু উদ্বেগ
সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিজেদের মধ্যে কার্বন সঞ্চয় করে রাখে। কিন্তু সুন্দরী গাছের মৃত্যু, বনের গাছের গঠন পরিবর্তন এবং নতুন চারা জন্মানোর হার কমে যাওয়ায় এ সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গত তিন দশকে সুন্দরবনের কার্বন শোষণ ক্ষমতা ১৫ শতাংশ কমেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবনের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের পানির প্রভাব থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বনের গাছের স্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব শুধু বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উপকূলের পরিবেশ, জীবিকা ও মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও পড়তে পারে।
সুন্দরীর জায়গা নিচ্ছে অন্য প্রজাতির গাছ
গবেষকদের আশঙ্কা, সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমতে থাকলে সুন্দরবনের সামগ্রিক বৃক্ষবিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় সুন্দরীর পরিবর্তে সিংড়া, আমুর ও গরান গাছের বিস্তার বাড়ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বনের একটি প্রধান বৃক্ষপ্রজাতির আধিপত্য কমে গেলে প্রাণীদের খাদ্য ও আশ্রয়ের ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল, প্রজাতিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবনের প্রতিটি উদ্ভিদ ও প্রাণী এই জটিল বাস্তুতন্ত্রের অংশ। তাই সুন্দরী গাছের সংকটকে শুধু একটি বৃক্ষপ্রজাতির রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, এটি সুন্দরবনের প্রথম ভিত্তিমূলক সমীক্ষা। টপ-ডাইং রোগ শতাব্দীপ্রাচীন সমস্যা।
সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, রোগের বিস্তার নির্ণয় এবং আক্রান্ত গাছের স্বাস্থ্যগত অবস্থা মূল্যায়ন জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি লবণাক্ততা ও মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ, প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের পরিস্থিতি যাচাই এবং সুন্দরী গাছের চারা টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বনের বিভিন্ন এলাকায় কোন প্রজাতির গাছ বাড়ছে বা কমছে, তার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এতে সুন্দরবনের বৃক্ষবিন্যাস ও জীববৈচিত্র্যের পরিবর্তন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
বিশ্বঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, উপকূলীয় সুরক্ষা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরী গাছের আগামরা রোগ এবং কার্বন শোষণ সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো উদ্বেগজনক প্রবণতা মোকাবিলায় এখনই প্রয়োজন সমন্বিত গবেষণা, নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগ। তা না হলে ভবিষ্যতে সুন্দরবনের পরিচিত রূপ ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।