ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
“মা একটি ছোট শব্দ হলেও মায়ের কাছে সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। তেমনি একজন সন্তানের কাছে মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। একজন সুশিক্ষিত মা পারেন একটি শিক্ষিত জাতির জন্ম দিতে। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মা একেকটি সুরভিত ফুল আর প্রতিটি ঘর একেকটি স্কুল।” —এমন মন্তব্য করেছেন সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বিপিএম (বার)।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার তালম ইউনিয়নের কুন্দাশন উচ্চ বিদ্যালয়ে দিনব্যাপী আয়োজিত মা ও অভিভাবক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সমাবেশে সন্তানদের সুশিক্ষিত ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মাদক থেকে সন্তানদের দূরে রাখা এবং মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষাজীবন, আচরণ ও ভবিষ্যৎ গঠনে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও করণীয় তুলে ধরা হয়।
পরিবারই সন্তানের শিক্ষার প্রথম পাঠশালা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, একটি শিশুর জীবনে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকেই শিশুর নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলাবোধ, দায়িত্বশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে। একজন মা সন্তানের সবচেয়ে কাছের মানুষ হওয়ায় তার আচরণ, শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা সন্তানের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
তিনি বলেন, সন্তানকে শুধু বিদ্যালয়ে পাঠালেই অভিভাবকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানের পড়াশোনা, বন্ধু-বান্ধব, চলাফেরা, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং মানসিক অবস্থার প্রতিও অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। সন্তান যেন ভুল পথে পরিচালিত না হয়, সে জন্য ছোটবেলা থেকেই তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝাতে হবে।
সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পাশাপাশি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সন্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের সমস্যা মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব বলে সমাবেশে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাল্যবিবাহ ও মাদক প্রতিরোধে সচেতনতার আহ্বান
সমাবেশে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। অল্প বয়সে বিয়ে একটি শিশুর শিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে সন্তানদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পরিবার ও সমাজকে সচেতন করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
একই সঙ্গে কিশোর-কিশোরীদের মাদক থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সন্তানদের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তাদের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার মতো উদ্যোগের গুরুত্বও আলোচনায় উঠে আসে।
বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ঘুম ও সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সন্তানদের মোবাইল ব্যবহারে ভারসাম্য বজায় রাখা, পড়াশোনার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা এবং খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
মা ও অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব
বক্তারা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি সৎ, মানবিক, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের নিয়মিত সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজখবর নেওয়া, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে মায়েদের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ সন্তানের শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে সমাবেশে আলোচনা করা হয়।
উপস্থিত ছিলেন প্রশাসন ও স্থানীয় পর্যায়ের ব্যক্তিরা
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. শাহানশাহ তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান এবং তাড়াশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. ইমাম জাফর।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন তাড়াশ উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আব্দুর রহিম, তালম ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি সোহরাব হোসেন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান হোসেন, কুন্দাশন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুর রশিদ, অভিভাবক সদস্য মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং উপজেলা ছাত্র প্রতিনিধি মেহেদী হাসান নিরবসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সমাবেশে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সী মায়েরা অংশ নেন। সন্তানদের সুশিক্ষা, নৈতিকতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগের গুরুত্বের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের আলোচনা এগিয়ে যায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের মা ও অভিভাবক সমাবেশ পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। সন্তানদের প্রতি যত্নশীল দৃষ্টিভঙ্গি, নিয়মিত তদারকি এবং নৈতিক শিক্ষার চর্চা জোরদার করা গেলে বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।