ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
বিকট শব্দে কেঁপে উঠেছিল চারপাশ। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে মুহূর্তেই আগুনের মতো ঝলসে উঠেছিল আকাশ। চোখের সামনে উঠানের উঁচু তালগাছে আঘাত হেনেছিল বজ্রপাত। প্রচণ্ড শব্দের পর গাছটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলেও বাড়িতে থাকা কারও কোনো ক্ষতি হয়নি। ২৪ বছর আগের সেই দৃশ্য আজও স্পষ্ট মনে আছে আবুল কালাম আজাদের।
সেদিনের সেই বজ্রপাতই বদলে দেয় তার জীবন। মনে প্রশ্ন জাগে—বজ্রপাতের সময় একটি তালগাছ যদি মানুষের আশপাশে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাহলে আরও বেশি তালগাছ থাকলে কি বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তালগাছের প্রতি তৈরি হয় গভীর ভালোবাসা। শুরু হয় বীজ সংগ্রহ, রোপণ ও পরিচর্যার এক দীর্ঘ যাত্রা।
এরপর কেটে গেছে ২৪ বছর। পেশায় দর্জি আবুল কালাম আজাদ এখন সিরাজগঞ্জে পরিচিত ‘তালগাছ প্রেমী’ নামে। নিজের আয় থেকে টাকা খরচ করে, নিজের হাতে মাটি কেটে তিনি এ পর্যন্ত রোপণ করেছেন সাড়ে ১১ হাজারের বেশি তালবীজ। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে বপন করেছেন প্রায় দুই হাজার খেজুরের বীজ। গাছ লাগানোর পর দায়িত্ব শেষ হয়নি; বছরের পর বছর ধরে সেগুলোর পরিচর্যাও করে চলেছেন তিনি।
যে বজ্রপাত বদলে দিল সবকিছু
২০০২ সালের বর্ষার এক দুপুর। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কালিয়াহরিপুর ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রামে মামার বাড়িতে গিয়েছিলেন আবুল কালাম। বাড়িতে ছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন আত্মীয়-স্বজন। হঠাৎ শুরু হয় বৃষ্টি, সঙ্গে একের পর এক বজ্রপাত।
একপর্যায়ে বিকট শব্দে একটি বজ্রপাত আঘাত করে উঠানের উঁচু তালগাছে। চোখের সামনে গাছটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। অথচ বাড়িতে থাকা মানুষজন সবাই অক্ষত থাকেন।
ঘটনাটি গভীরভাবে নাড়া দেয় আবুল কালামকে। পরে আশপাশের মানুষের কাছ থেকে তালগাছ ও বজ্রপাত সম্পর্কে নানা কথা শুনতে থাকেন। বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হলে তালগাছের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে পড়াশোনাও শুরু করেন। একটি জাতীয় দৈনিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের তালগাছ ও পরিবেশবিষয়ক লেখা তার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
সেখান থেকেই শুরু হয় তার বৃক্ষরোপণের অভিযান।
প্রথম বছরেই এক হাজার বীজ
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই আশপাশের বাড়ি থেকে তালবীজ সংগ্রহ করতে শুরু করেন আবুল কালাম। ২০০২ সালের আগস্টের দিকে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ এলাকায় সেগুলো রোপণ করেন। প্রথম বছরেই প্রায় এক হাজার তালবীজ বপন করেন তিনি।
এরপর প্রতি বছর বাড়তে থাকে সেই সংখ্যা। কখনো গ্রামে গিয়ে, কখনো তাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে, আবার কখনো শহরের আবর্জনার স্তূপ থেকে তালবীজ সংগ্রহ করেছেন। সদর উপজেলার ১৫ থেকে ২০টি গ্রাম তার বীজ সংগ্রহের অন্যতম উৎস।
কেউ বীজ বিক্রি করেন, কেউ আবার বিনা মূল্যে দিয়ে দেন। প্রতিটি বীজ সংগ্রহ ও পরিবহনে গড়ে প্রায় চার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। সেই অর্থের বড় অংশই আসে দর্জির কাজ করে উপার্জিত টাকা থেকে।
সাইকেলই তার বাহন, কোদাল-দা সঙ্গী
আবুল কালামের এই কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—কোনো আনুষ্ঠানিক প্রকল্প নেই, নেই বড় কোনো অর্থায়ন। তার সম্বল নিজের শ্রম, সময় ও ভালোবাসা।
প্রতিদিন সাইকেলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সঙ্গে থাকে কোদাল, দা ও পানির বোতল। কোথাও চারার গোড়ায় আগাছা জন্মালে তা পরিষ্কার করেন। বৃষ্টিতে মাটি সরে গেলে অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে গোড়া ভরাট করেন। প্রয়োজন হলে পানি দেন। কোথাও গাছ নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে চারা রোপণ করেন।
শুধু নিজের গাছ নয়, স্থানীয় মানুষকেও গাছ রক্ষায় উৎসাহিত করেন তিনি।
তিন কিলোমিটারজুড়ে তার সবুজ স্মৃতি
সিরাজগঞ্জ শহরের কাটাখালি, ইলিয়ট ব্রিজ, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ, সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহররক্ষা বাঁধের ক্রসবার-৩ ও ৪ নম্বর এলাকা, সিরাজগঞ্জ-কাজীপুর সড়কসহ সদর উপজেলার কালিয়াহরিপুর, বহুলী ও শিয়ালকোল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছে তার লাগানো তালগাছ।
শহররক্ষা বাঁধের ক্রসবার-৩ এলাকা থেকে বিসিক শিল্পপার্কের বেলুটিয়া পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে দেখা যায় তার লাগানো বহু তালগাছ। কোনোটি আট-দশ বছরের পুরোনো, কোনোটি তার চেয়েও বেশি বয়সী। অনেক গাছ এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
এসব গাছে বাসা বাঁধছে বাবুইসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। কোথাও গাছে ফল ধরেছে। স্থানীয় শিশু-কিশোরদেরও এসব গাছের সঙ্গে তৈরি হয়েছে এক ধরনের সম্পর্ক।
২০০২ সালে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে লাগানো প্রায় অর্ধশত তালগাছ এখন পরিণত। গাছে ফল ধরলে শিক্ষার্থীরা কাঁচা তাল সংগ্রহ করেন। পাকা তাল থেকে তৈরি হয় পিঠা, কেকসহ নানা খাবার।
এই দৃশ্যই আবুল কালামের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সব গাছ টেকেনি, থামেননি তিনিও
দীর্ঘ পথচলায় সাফল্যের পাশাপাশি হতাশাও এসেছে। সড়ক প্রশস্তকরণে অনেক গাছ কাটা পড়েছে। স্থানীয় মানুষের অসচেতনতায় কিছু চারা নষ্ট হয়েছে। আবার হাতপাখা তৈরির জন্য অনেকে ছোট তালগাছের পাতা কেটে নেওয়ায় বহু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
২০২১ সালের দিকে সিরাজগঞ্জ-কাজীপুর সড়ক প্রশস্ত করার সময় তার লাগানো বেশ কিছু গাছ উপড়ে ফেলা হয়।
তবুও থামেননি আবুল কালাম। একটি গাছ হারালে অন্য জায়গায় আরেকটি গাছ লাগিয়েছেন। কারণ তার কাছে গাছ লাগানো কোনো সাময়িক শখ নয়; এটি এক ধরনের দায়িত্ব।
শুরুতে বিরোধিতা, এখন সহযোগিতা
আবুল কালামের এই কাজের শুরুটা সহজ ছিল না। পরিবারের সদস্যরা একসময় তার ওপর বিরক্ত হতেন। প্রতিবেশীরাও তার এই ‘পাগলামি’ ভালোভাবে নেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে।
বাঁধের পাশের বাসিন্দা আশরাফ সেখ বলেন, নিজের জায়গা না থাকলেও রাস্তার পাশ কিংবা সরকারি জায়গায় তালগাছ লাগিয়েছেন আবুল কালাম। নিজের টাকা ও শ্রম ব্যয় করে এত বছর ধরে এ কাজ চালিয়ে যাওয়া সত্যিই বিরল।
তার সহকর্মী মির্জা জাকির হোসেনের ভাষ্য, আবুল কালাম লাগানো গাছগুলোর হিসাব খাতায় লিখে রাখেন। সেই হিসাব অনুযায়ী ২৪ বছরে সাড়ে ১১ হাজারের বেশি তালবীজ রোপণ করেছেন তিনি।
দর্জির সংসার, গাছই যেন আরেক পরিবার
১৯৬২ সালের ৫ মার্চ সিরাজগঞ্জ পৌর শহরের সয়াধানগড়া মধ্যপাড়া গ্রামে জন্ম আবুল কালাম আজাদের। বাবা রহতুল্লাহ তালুকদার ছিলেন দর্জি। ১৯৭৬ সালে জ্ঞানদায়িনী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। বাবার পেশায় যুক্ত হন এবং এখনও দর্জির কাজ করছেন।
স্ত্রী ও চার মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। অন্য দুই মেয়ে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সংসারের দায়িত্ব সামলেও গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে যাননি তিনি।
প্রশাসনের পাশে থাকার আশ্বাস
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন খান বলেন, তালগাছের প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে আবুল কালাম যে কাজ করছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তিনি কোনো সহযোগিতা চাইলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাশে থাকার আশ্বাস দেন ইউএনও।
স্বপ্নটা আরও বড়
আবুল কালামের কাছে সাড়ে ১১ হাজার তালবীজ কেবল একটি সংখ্যা নয়। প্রতিটি বীজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার শ্রম, সময় ও স্বপ্ন। কিছু গাছ বড় হয়েছে, কিছু নষ্ট হয়েছে। কিছু হয়তো আর কোনোদিন খুঁজেও পাওয়া যাবে না। কিন্তু নতুন গাছ লাগানোর আগ্রহ তার কমেনি।
এখনও প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে বের হন তিনি। সঙ্গে থাকে কোদাল, দা আর পানির বোতল। কখনো নতুন কোনো জায়গায় বীজ বোনেন, কখনো পুরোনো গাছের গোড়া পরিষ্কার করেন।
একটি বজ্রপাত ২৪ বছর আগে তার মনে যে প্রশ্ন তৈরি করেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই যেন আজও ছুটে চলেছেন আবুল কালাম। নিজের জীবনের সঞ্চয় দিয়ে গড়ে তুলছেন একেকটি সবুজ স্মৃতি। তার লাগানো তালগাছগুলো হয়তো একদিন তাকে ছাড়িয়ে আরও দীর্ঘ জীবন পাবে। ছায়া দেবে মানুষকে, আশ্রয় দেবে পাখিকে, ফল দেবে প্রকৃতিকে।
আর তখন হয়তো সাড়ে ১১ হাজার বীজের হিসাব ছাড়িয়ে যাবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়—একজন সাধারণ দর্জি, যিনি নিজের হাতে নিজের এলাকার জন্য একটি সবুজ ভবিষ্যৎ বুনে চলেছেন।