মোক্তার হোসেন, কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রার প্রত্যন্ত ফতেকাটি গ্রামে দ্বীনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে ফতেকাটি নূরানী তালিমুল কুরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও ইয়াতিমখানা। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন স্থানীয় মানুষের কাছে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাদ্রাসাটির শিক্ষা কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত পরিসর বেড়েছে। বর্তমানে এখানে আবাসিক, অনাবাসিক ও ডে-কেয়ার সুবিধায় শিক্ষার্থীদের কুরআন শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। মাদ্রাসায় পরিচালিত হচ্ছে নূরানী বিভাগ, নাজেরা বিভাগ এবং হেফজুল কুরআন বিভাগ।
বর্তমানে প্রায় ১২০ জন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানটিতে কুরআন ও দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে হেফজ বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে এ বছর চারজন পাগড়ি গ্রহণের মাধ্যমে হাফেজ হওয়ার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
মানসম্মত শিক্ষায় গুরুত্ব
মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীদের কেবল কুরআন মুখস্থ করানোর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান উপদেষ্টা পীরে কামেল আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আকবর হোসেনের দিকনির্দেশনা ও প্রচেষ্টা মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মাদ্রাসার সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম সানা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু কুরআন মুখস্থ করানো নয়, বরং নৈতিক ও আদর্শ মানুষ গড়ে তোলা। প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শে আমরা শিক্ষার মান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”
নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার ব্যবস্থা
মাদ্রাসার মুহতামিম হাফেজ মাওলানা মাহবুবুর রহমান বলেন, “কুরআন-সুন্নাহর আলোকে শিক্ষার্থীদের গড়ে তুলতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও শিক্ষার্থীদের মেধা-পরিশ্রমের কারণে প্রতিবছর আমাদের ফলাফল আরও ভালো হচ্ছে।”
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের পড়া মুখস্থ, পুনরাবৃত্তি ও নির্ধারিত পাঠ যথাযথভাবে আয়ত্ত করার বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ আব্দুস সোবহান, হাফেজ তামিম হোসেন, হাফেজ মুস্তাকিম বিল্লাহ ও মাস্টার হারুন অর রশিদ জানান, পড়াশোনার মান উন্নয়নে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও বিশেষ তদারকির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ বেড়েছে।
প্রত্যন্ত এলাকায় দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফতেকাটি একটি প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় আগে অনেক পরিবারকে সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষার জন্য দূরের প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হতো। বর্তমানে নিজ এলাকায় আবাসিক ও অনাবাসিক সুবিধাসহ মাদ্রাসা থাকায় অনেক পরিবার সহজেই সন্তানদের কুরআন শিক্ষার সুযোগ দিতে পারছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, সুন্দর পরিবেশে দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তুষ্টি বেড়েছে। একই সঙ্গে শিশু-কিশোরদের কুরআন শিক্ষার প্রতি আগ্রহও বাড়ছে।
ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা
মাদ্রাসার সেক্রেটারি মুহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, “স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা ও শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে এটি খুলনা জেলার একটি আদর্শ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। এ জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”
প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষার্থীদের জন্য আরও উন্নত শিক্ষা পরিবেশ তৈরি, শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভবিষ্যতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরু করা ফতেকাটি নূরানী তালিমুল কুরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা এভাবেই ধীরে ধীরে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। প্রত্যন্ত জনপদে কুরআন ও দ্বীনি শিক্ষার বিস্তারে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসীর।