মুফতি জাকারিয়া মাসউদ
ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ যুগ যুগ ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি ন্যায়, সহমর্মিতা ও উত্তম আচরণের শিক্ষা দিলেও মুসলমানদের নিজস্ব আকীদা, বিশ্বাস ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
বর্তমানে বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা, পাঠাবলি বা চরক মেলাকে কেন্দ্র করে কিছু মুসলমানের অংশগ্রহণ, আনন্দ-উল্লাস কিংবা এটিকে সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন—
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সহযোগিতা কর এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।”
— (সূরা মায়িদা: ২)
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যদি ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়, তাহলে সেখানে অংশগ্রহণ, উৎসাহ প্রদান বা সহযোগিতা করা মুসলমানের জন্য বৈধ নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন—
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
— (আবু দাউদ, মিশকাত: ৪৩৪৭)
এই হাদিস দ্বারা আলেমগণ ব্যাখ্যা করেছেন, মুসলমানদের উচিত নিজেদের ইসলামী পরিচয় ও সংস্কৃতি অক্ষুণ্ণ রাখা এবং অন্য ধর্মের ধর্মীয় প্রতীক, আচার কিংবা উৎসবকে অনুকরণ না করা।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন—
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
“মুমিনরা মিথ্যা ও অসার কার্যকলাপে অংশ নেয় না; আর যখন তারা অনর্থক কাজের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন মর্যাদার সঙ্গে তা এড়িয়ে যায়।”
— (সূরা ফুরকান: ৭২)
এ আয়াতের আলোকে অনেক মুফাসসির ব্যাখ্যা করেছেন যে, ঈমানদার ব্যক্তি এমন কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবে না, যা ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا
“যে ব্যক্তি অন্য সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
— (তাবরানী, মিশকাত: ৪৩৪৮)
তাই মুসলমানদের জন্য প্রয়োজন, তারা যেন অন্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলেও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসগত আচার থেকে নিজেদের পৃথক রাখে।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখা জরুরি— ইসলাম কখনো অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষ, অবিচার বা সহিংসতার শিক্ষা দেয় না। বরং তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতাকে সম্মান করা, প্রতিবেশী হিসেবে উত্তম আচরণ করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা ইসলামেরই শিক্ষা। কিন্তু সেই সম্প্রীতির অর্থ এই নয় যে, একজন মুসলমান অন্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে সেটিকে নিজের সংস্কৃতি বা আনন্দ-উৎসব হিসেবে গ্রহণ করবে।
অতএব, মুসলমানদের উচিত নিজেদের ঈমান, আকীদা ও ইসলামী সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করা এবং এমন সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সন্দেহজনক বা নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং ইসলামের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।