কাগজ ডেক্স:
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত পশু চুরি ও অন্যান্য অপরাধ প্রবণতা ঠেকাতে গ্রামবাসী ও পুলিশের সমন্বয়ে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা উদ্যোগ। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখন রাত জেগে পালাক্রমে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বসানো হয়েছে অস্থায়ী চেকপোস্ট।
উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের সাকোডিঘি, বিনোদপুর, খালকুলা ও নওগাঁ বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় যুবক ও গ্রামবাসীরা দলবদ্ধভাবে রাতের বেলা পাহারায় অংশ নিচ্ছেন। কেউ লাঠি হাতে, কেউ টর্চলাইট নিয়ে নির্দিষ্ট পয়েন্টে অবস্থান করছেন। গ্রামের প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো হয়েছে বাঁশের তৈরি শতাধিক অস্থায়ী চেকপোস্ট, যেখানে সন্দেহজনক যানবাহন থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছরই গরু-ছাগল চুরির ঘটনা বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে চোরচক্র বিভিন্ন গ্রামে প্রবেশ করে খামারিদের পশু চুরি করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে এবার আগে থেকেই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে গ্রামবাসী। নিজেদের সম্পদ রক্ষায় তারা স্বেচ্ছায় পাহারার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন।
এ বিষয়ে নওগাঁ ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা জানান, “গত কয়েক বছর ধরে ঈদের আগে গরু-ছাগল চুরির ঘটনা বাড়ছে। তাই এবার আমরা নিজেরাই রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি। পুলিশও আমাদের সহযোগিতা করছে। সবাই মিলে থাকলে চোরেরা সুযোগ পাবে না।”

উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের উদ্যোগে পুরো তাড়াশ উপজেলায় ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ৯টি টিম গঠন করা হয়েছে। এসব টিমে পুলিশ সদস্য ও গ্রাম পুলিশের সমন্বয়ে ৩ থেকে ৮ জন সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। তারা রাত-দিন পালা করে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, হাট-বাজার ও জনপদ এলাকায় নিয়মিত টহল দিচ্ছেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, টহল টিমগুলো শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কাজ করছে না, পাশাপাশি খামারিদের মধ্যে সচেতনতাও তৈরি করছে। তারা গরু-ছাগল নিরাপদ স্থানে রাখা, গোয়ালঘর মজবুত করা এবং সন্দেহজনক ব্যক্তি দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর বিষয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপন করা চেকপোস্টে যানবাহন থামিয়ে তল্লাশি করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় অচেনা গাড়ি ও সন্দেহজনক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
তাড়াশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, বিগত বছরগুলোতে কোরবানির ঈদের আগে বিভিন্ন এলাকায় গরু-ছাগল চুরির একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা রোধে এবার আগে থেকেই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, “সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপার মহোদয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এবার আমরা পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামবাসীদের সম্পৃক্ত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছি। ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় ৯টি টিম নিয়মিত টহল দিচ্ছে। প্রতিটি টিমে ৩ থেকে ৮ জন সদস্য রয়েছেন। তারা রাতদিন পালা করে দায়িত্ব পালন করছেন।”
ওসি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু চুরি প্রতিরোধ নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতা তৈরি করা। পাশাপাশি যেকোনো ধরনের অপরাধ দমনেও আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। পুলিশি টহল ও নজরদারি ঈদের আগ পর্যন্ত আরও জোরদার থাকবে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, পুলিশের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে গঠিত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা এলাকায় চুরি-ডাকাতি অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পরিবেশও তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামভিত্তিক এই ধরনের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা শুধু সাময়িক সমাধান নয়, বরং এটি একটি সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর উদাহরণ। যেখানে পুলিশ ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করলে অপরাধ দমন অনেক বেশি কার্যকর হয়।
সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে তাড়াশ উপজেলায় এখন গ্রামজুড়ে চলছে রাতজাগা পাহারা, পুলিশের টহল এবং স্থানীয়দের সক্রিয় অংশগ্রহণে এক ধরনের সম্মিলিত নিরাপত্তা বলয়। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে এবং চুরি-ডাকাতি প্রতিরোধে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।