নিজস্ব প্রতিবেদক,
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের চান্দাইকোনা স্বাস্থ্যসেবা পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র জনবল সংকট ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। এতে প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রটিতে অনুমোদিত মোট ৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, ওষুধ বিতরণ এবং রোগী ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী নারী, শিশু ও সাধারণ রোগীরা চিকিৎসা নিতে কেন্দ্রে এলেও অনেকেই প্রয়োজনীয় ওষুধ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রতি মানুষের আস্থাও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগী আছিয়া খাতুন বলেন, “আমরা অসুস্থ হয়ে এখানে চিকিৎসা নিতে আসি। কিন্তু বেশিরভাগ সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ পেলেও ওষুধের অভাবে বাইরে থেকে কিনতে হয়। দরিদ্র মানুষের জন্য এটি খুবই কষ্টের।”
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত জনবল নিয়ে কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমাদের এখানে অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র দুইজন কর্মরত আছি। এত অল্প জনবল দিয়ে একটি স্বাস্থ্যসেবা পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সব ধরনের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধও নিয়মিত বরাদ্দ পাওয়া যায় না। ফলে রোগীদের অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না।”
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী না থাকায় পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য বাস্তবায়নেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জানা গেছে, বর্তমানে কেন্দ্রটিতে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফার্মাসিস্ট, ভিজিটর এবং চারজন মাঠকর্মীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এসব পদে নিয়োগ না হওয়ায় কর্মরত কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে, যা সেবার মানেও প্রভাব ফেলছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শহিদুল আলম বলেন, “জনবল সংকটের বিষয়টি আমাদের জানা আছে। ২০২০ সালে নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে নিয়োগ প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ হিসেবে ভাইভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলে জনবল সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করছি।”
তিনি আরও জানান, প্রতিবছর প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ সংগ্রহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ের এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি এলাকার দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও ওষুধ সংকটের কারণে মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন, যা অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে জনবল নিয়োগ, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের মতে, সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে চান্দাইকোনা স্বাস্থ্যসেবা পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি আবারও পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে এবং এলাকার হাজারো মানুষের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।