ফিরোজ আল আমিন
কলামিস্ট ও সাংবাদিক
পরকীয়া—শব্দটি শুনলেই সমাজে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, নিন্দা, নৈতিকতার প্রশ্ন এবং একপাক্ষিক দোষারোপ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় নারীকে। প্রচলিত ধারণা হলো, নারীরা নাকি অর্থ, বিলাসিতা কিংবা শারীরিক আকর্ষণের কারণেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বাস্তবতা কি সত্যিই এত সরল?
সম্পর্ক, পরিবার এবং মানব আচরণ নিয়ে মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, পরকীয়া সাধারণত কোনো একটি কারণের ফল নয়। এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, মানসিক দূরত্ব, যোগাযোগের অভাব, আবেগীয় অপূর্ণতা, পারস্পরিক অসম্মান এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মতো একাধিক বিষয়ের সম্মিলিত পরিণতি। তাই পরকীয়াকে কেবল নৈতিক অবক্ষয় হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না।
একটি সংসার টিকে থাকে বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং আন্তরিক যোগাযোগের ওপর। যখন এই ভিত্তিগুলো দুর্বল হতে শুরু করে, তখন সম্পর্কেও ফাটল দেখা দেয়। অনেক স্বামী-স্ত্রী একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে বহু দূরে অবস্থান করেন। সংসারের ব্যস্ততা, কর্মজীবনের চাপ, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে অনেকেই একে অপরের অনুভূতির প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে জন্ম নেয় একাকীত্ব, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়।
এই আবেগীয় দুর্বলতার সুযোগ নেয় কিছু অসাধু মানুষ। তারা অতিরিক্ত প্রশংসা, অবিরাম খোঁজখবর, দামি উপহার, আর্থিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কিংবা বিলাসী জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে। মনোবিজ্ঞানে এই কৌশলকে অনেক সময় “লাভ বম্বিং” বলা হয়। এর উদ্দেশ্য প্রকৃত ভালোবাসা নয়; বরং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে নির্ভরশীল করে তোলা। অনেকেই এই কৃত্রিম ভালোবাসাকে সত্যিকারের সম্পর্ক ভেবে ভুল করেন। পরে যখন বাস্তবতা সামনে আসে, তখন ভেঙে যায় সংসার, সম্পর্ক, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও।
তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, পরকীয়ার দায় কখনোই একতরফা নয়। একজন মানুষ যদি বছরের পর বছর অবহেলা, অসম্মান বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, তবে সেই সম্পর্কের সংকট তৈরিতে অন্য সঙ্গীরও দায় থাকতে পারে। আবার এটিও সত্য যে, সম্পর্কে সমস্যা থাকলেও পরকীয়া কোনো নৈতিক বা গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। সম্পর্কে অসন্তোষ থাকলে খোলামেলা আলোচনা, পারিবারিক সমঝোতা, কাউন্সেলিং কিংবা প্রয়োজনে আইনসম্মত বিচ্ছেদ—এসবই হতে পারে দায়িত্বশীল পথ। গোপন সম্পর্ক সেই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই বাস্তবতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একটি নিরীহ কথোপকথন অনেক সময় ধীরে ধীরে আবেগীয় সম্পর্কে রূপ নেয়। মানুষ নিজের অজান্তেই এমন একজনের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন, যিনি হয়তো তার বাস্তব জীবনের অংশ নন। ভার্চুয়াল ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় বাস্তব সম্পর্কের দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
পরকীয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবার, বিশেষ করে সন্তানরা। বাবা-মায়ের সম্পর্কের ভাঙন তাদের মানসিক বিকাশ, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ পারিবারিক জীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তাই এটি কেবল দুইজন মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা।
আমাদের সমাজে প্রয়োজন বিচার নয়, সচেতনতা। প্রয়োজন সম্পর্কের সমস্যাকে সময় থাকতে চিহ্নিত করা, একে অপরকে সময় দেওয়া, সম্মান করা, মন খুলে কথা বলা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার পরামর্শ গ্রহণ করা। সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি সন্দেহ নয়, বিশ্বাস; নিয়ন্ত্রণ নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা।
সবশেষে বলা যায়, পরকীয়া কেবল শরীরের আকর্ষণের গল্প নয়; এটি প্রায়ই সম্পর্কের নীরব ভাঙন, অপূর্ণ আবেগ, ভুল সিদ্ধান্ত এবং যোগাযোগের ব্যর্থতার প্রতিফলন। তাই একপাক্ষিক দোষারোপের পরিবর্তে আমাদের উচিত সম্পর্কের সংকটকে বোঝা, পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা এবং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ গোপন সম্পর্কে নয়, বরং খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে উৎসাহিত হয়। কারণ একটি সুখী পরিবার গড়ে ওঠে বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক সম্মানের ওপর—প্রতারণার ওপর নয়।