মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি:
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, তবুও থেমে নেই পথচলা। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার ৬৮ বছর বয়সী সংবাদপত্র হকার আবদুস শহিদ গত ৪৬ বছর ধরে নিরলসভাবে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছেন দেশ-বিদেশের খবর। রোদ, বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত—কোনো প্রতিকূলতাই তাকে তার দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে পারেনি।
রামগতি উপজেলার অফিসপাড়া থেকে শুরু করে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ভোরে পায়ে হেঁটে জাতীয় দৈনিক পত্রিকা পৌঁছে দেন তিনি। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পেশায় নিয়োজিত আবদুস শহিদ স্থানীয়দের কাছে একজন পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
সংবাদপত্র বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই দীর্ঘদিন ধরে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করে আসছেন তিনি। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে টানাপোড়েনের সংসার চালাতে গিয়ে জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। আর্থিক সংকট ও অভাব-অনটন তার নিত্যসঙ্গী হলেও সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন অবিরাম।
আবদুস শহিদ আক্ষেপ করে বলেন, “দীর্ঘ ৪৬ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করছি। কত মানুষকে প্রতিদিন নতুন খবরের আলো পৌঁছে দিয়েছি, অথচ আমার নিজের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো চলাফেরা করাও কষ্টকর। সবার কাছে শুধু দোয়া চাই।”
একই পেশায় কর্মরত আরেক সংবাদপত্র বিক্রেতা বেলাল হোসেন, যিনি ১৬ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করছেন, হকারদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, “সরকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নানা ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু সংবাদপত্র হকারদের জন্য তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই আয়ে পরিবার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।”
সংবাদপত্র হকারদের মানবিক ও আর্থসামাজিক অবস্থার প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রামগতি রিপোর্টার্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোখলেছুর রহমান ধনু। তিনি বলেন, “একজন হকার পত্রিকা বিক্রি করে যে সামান্য আয় করেন, তা দিয়ে বর্তমান বাজারে পরিবার পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। পত্রিকা কর্তৃপক্ষ, সরকার এবং সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা যদি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে এসব পরিশ্রমী মানুষের জীবনমান কিছুটা হলেও উন্নত হতে পারে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সংবাদপত্র শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এসব হকারই প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠকের হাতে পৌঁছে দেন। অথচ তাদের জীবনযাত্রা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজের সেবায় নিয়োজিত এসব মানুষকে যথাযথ মূল্যায়ন ও সহায়তা প্রদান করা সময়ের দাবি।
রামগতির পাঠক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসাই এখন আবদুস শহিদের মতো হকারদের প্রধান অনুপ্রেরণা। প্রচারবিমুখ, সৎ ও পরিশ্রমী এই মানুষগুলোর সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের জন্য সমাজের সকল স্তরের মানুষের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা।