হৃদয় রায়হান, নিজস্ব প্রতিনিধি :
কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বহুল আলোচিত সরকারি ইজারাকৃত তড়িয়া বালুমহালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে প্রশাসন। অবৈধ বালু উত্তোলন, সীমানা লঙ্ঘন এবং নদী ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে বালুমহালের বিভিন্ন স্থানে লাল পতাকা টাঙিয়ে নিষিদ্ধ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রশাসনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে একদিকে নদীতীরবর্তী ভুক্তভোগী মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে, অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন বৈধ ইজারাদার, নৌকার মাঝি ও বালুমহাল সংশ্লিষ্ট হাজারো শ্রমিক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ইজারা দেওয়া হলেও তড়িয়া বালুমহালে নির্ধারিত সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন এবং ইজারার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও ভেড়ামারা উপজেলা প্রশাসন যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে বালুমহালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তীরবর্তী বাঁধ এবং পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “ইজারা থাকলেই যে কেউ ইচ্ছামতো বালু উত্তোলন করতে পারবে না। নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে কিংবা ড্রেজার ও ফিলিং মেশিন ব্যবহার করে নদীর ক্ষতি করা হলে প্রশাসন কঠোর ব্যবস্থা নেবে। সরকারি সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় আমরা কোনো ছাড় দেব না।”
ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমিরুল আরাফাত জানান, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। তিনি বলেন, “তড়িয়া বালুমহালে সীমানা লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেউ যাতে গোপনে বা রাতের আঁধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করতে না পারে, সেজন্য লাল পতাকা দিয়ে এলাকাটি চিহ্নিত করা হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ডা. গাজী আশিক বাহার বলেন, সরকারি খাস জমি ও নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণে সরেজমিন তদন্ত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ইজারার আড়ালে অসাধু চক্র কৃষিজমি ও নদীতীরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে বালু উত্তোলন করে থাকে। সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত মনিটরিং ও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে।
তবে প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তড়িয়া বালুমহালের বৈধ ইজারাদার শফিকুল ইসলাম ডাবলুসহ স্থানীয় বালু ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, সরকারের কাছ থেকে বৈধভাবে ইজারা গ্রহণ করে তারা নিয়মিত রাজস্ব ও টোল পরিশোধ করে আসছেন। হঠাৎ বালুমহাল বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে এবং হাজারো শ্রমিক জীবিকা সংকটে পড়েছেন।
ইজারাদারদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যক্তি অবৈধভাবে ড্রেজার ও ফিলিং মেশিন ব্যবহার করে বালু উত্তোলন করলেও তার দায়ভার এখন বৈধ ইজারাদার ও শ্রমিকদের ওপর এসে পড়েছে। এর প্রতিবাদে ইতোমধ্যে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন।
অন্যদিকে নদীতীরবর্তী বাসিন্দারা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে বসতভিটা, ফসলি জমি এবং নদীতীর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। বালু উত্তোলন বন্ধ হওয়ায় তারা আপাতত স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্তমানে তড়িয়া বালুমহাল এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জীবিকা রক্ষার দাবিতে শ্রমিকদের ক্ষোভ এবং পরিবেশ ও সরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থান—দুই পক্ষের এই টানাপোড়েন এখন কুষ্টিয়া জেলাজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।