মোখলেছুর রহমান ধনু
রামগতি-কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মেঘনা নদীর তীরবর্তী ঐতিহ্যবাহী বাত্তিরখাল মাছঘাট জামে মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিহিংসার জেরে দীর্ঘদিনের সচল এই মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চর মার্টিন ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত বাত্তিরখাল মাছঘাট জামে মসজিদটি প্রায় দুই দশক ধরে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। মাছঘাটের আড়তদার, জেলে, মাছ ব্যবসায়ীসহ প্রায় তিন শতাধিক মুসল্লি নিয়মিত এখানে নামাজ আদায় করতেন। কয়েক বছর ধরে মসজিদটিতে জুমার নামাজও অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের জন্য মক্তবের ব্যবস্থাও ছিল। স্থানীয়দের দাবি, প্রতি জুমায় প্রায় একশত মুসল্লির সমাগম হতো।
অভিযোগ রয়েছে, গত মাসের শুরুতে মাছঘাটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট একটি বিরোধের পর রাজনৈতিক বিভক্তি ক্রমে মসজিদকে ঘিরেও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। পরে মাছঘাট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পর স্থানীয় একটি পক্ষের উদ্যোগে মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয়।
এ ঘটনায় চরকালকিনি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল মজিদের নেতৃত্বে মসজিদটি ভাঙার অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মসজিদটির উন্নয়নের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিএসআইডি প্রকল্পের আওতায় কমলনগর উপজেলা এলজিইডি অফিস থেকে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই অর্থে মসজিদের ফ্লোর পাকাকরণের কাজ সম্পন্ন হয়। এছাড়া সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান মসজিদের উন্নয়নের জন্য আরও ৩ লাখ টাকা বিশেষ বরাদ্দ দেন। কিন্তু সেই অর্থ ব্যয়ের আগেই মসজিদটি ভেঙে ফেলা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ইউপি সদস্য আবদুল মজিদ মসজিদ ভাঙার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “মাছঘাট অন্যত্র স্থানান্তর হওয়ায় আমরা মসজিদটিও সরিয়ে নিয়েছি। ইমামের বেতনসহ মসজিদের খরচ আমরা বহন করতাম। তাই ঘাটের প্রয়োজনেই এটি অপসারণ করা হয়েছে।”
তবে সচল একটি মসজিদের পাকা ভিত্তি কেন সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো—এ প্রশ্নের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি তিনি।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, আল্লাহর ঘর কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি মুসল্লিদের ইবাদতের স্থান।
এলাকাবাসী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, মসজিদ পুনর্নির্মাণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে তারা জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ঘটনাটি স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। সচল একটি মসজিদ ভেঙে ফেলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন এলাকাবাসী।