সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জ জেলার চন্ডীদাসগাঁতী বাজার থেকে সরাইচন্ডি, ধোপাপাড়া, রহিমপুর ও চর পদমপাল এলাকার হাজারো মানুষের প্রতিদিনের চলাচলের একমাত্র ভরসা এখনো একটি অস্থায়ী ঘাট। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো—দীর্ঘদিন ধরে এ গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথে কোনো স্থায়ী ও নিরাপদ সেতু নির্মাণ করা হয়নি। ফলে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীর পানি বেড়ে গেলে নৌকা ছাড়া পারাপারের কোনো বিকল্প থাকে না, আর তখনই শুরু হয় চরম ভোগান্তি।
বর্ষার সময় প্রবল স্রোত ও অনিশ্চিত আবহাওয়ায় নৌকায় পারাপার হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, নারী ও শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করেন। অনেক সময় ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, লাইফজ্যাকেটের অভাব এবং মাঝিদের অনভিজ্ঞতার কারণে দুর্ঘটনার শঙ্কাও থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এটি শুধু একটি ঘাট নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য জীবনরেখা। কারণ সরাইচন্ডি, ধোপাপাড়া, রহিমপুর ও চর পদমপাল এলাকার মানুষ চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা ও জরুরি প্রয়োজনে এই পথ ব্যবহার করেন। বিকল্প কোনো সহজ সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এই ঘাটই তাদের একমাত্র ভরসা।
একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন ভয় নিয়ে স্কুলে যায়। নদী পার হতে গিয়ে অনেক সময় জামাকাপড় ভিজে যায়, বইপত্র নষ্ট হয়। সবচেয়ে বড় কথা, সবসময় প্রাণের ঝুঁকি থাকে। একটা স্থায়ী ব্রিজ হলে আমাদের এই কষ্ট আর থাকত না।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও একই অভিযোগ করেন। তাদের মতে, এই ঘাটের ওপর নির্ভর করেই এলাকার অর্থনীতি অনেকটা চলে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থার কারণে ব্যবসায়িক ক্ষতিও হচ্ছে নিয়মিত। বর্ষা মৌসুমে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বাজারে প্রভাব পড়ে, যার ফলে সাধারণ মানুষকেই ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সম্প্রতি স্থানীয় এক হৃদয়বিদারক ঘটনার পর এলাকাবাসীর ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। ধোপাপাড়া এলাকা থেকে একটি মরদেহ ভাঙাচোরা একটি অস্থায়ী কাঠামোর ওপর দিয়ে চন্ডীদাসগাঁতী কবরস্থানে নেওয়ার সময় দেখা যায়, জীবিত মানুষের মতোই মৃত্যুর পরও এই পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এই দৃশ্য অনেককে আবেগপ্রবণ করে তোলে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, “আজকে যখন লাশটা ওই ভাঙা পথ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমরা এখনো উন্নয়নের বাইরে পড়ে আছি। জীবিত মানুষ যেমন কষ্ট করে পার হয়, মৃত্যুর পরও সেই কষ্ট শেষ হয় না।”
এলাকাবাসীর দাবি, এটি কোনো নতুন সমস্যা নয়। বহু বছর ধরে তারা এই ঘাটে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় হতাশা দিন দিন বাড়ছে। তারা মনে করেন, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে কবে নাগাদ বাস্তব কাজ শুরু হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সচেতন মহল বলছে, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার এই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এখনো যদি মানুষ নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এলাকাবাসীর একটাই দাবি—এই ঘাটে আর কোনো মানুষ যেন ঝুঁকি নিয়ে নদী পার না হয়। বিশেষ করে কোনো মরদেহ বা জরুরি রোগীকে যেন এই ভাঙা পথে নিয়ে যেতে না হয়। তাদের ভাষায়, “জীবন বাঁচাতে যেমন নিরাপদ পথ দরকার, তেমনি মর্যাদাপূর্ণ শেষ যাত্রার জন্যও একটি নিরাপদ সেতু দরকার।”
সবশেষে এলাকাবাসী আশা করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং বহু বছরের এই ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে একটি স্থায়ী ও নিরাপদ সেতু নির্মাণ করবে।