হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
ক্যালেন্ডারের পাতায় তখনো ফুলকপির ভরা মৌসুম আসেনি। তবে মৌসুমের আগেই মাঠে ফুলকপির চাষ করে আশার আলো দেখছেন কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার তরুণ কৃষক ইমরান হোসেন নাহিদ। বাজারে আগাম সবজি তুলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় ৫০ শতক জমিতে মার্কেট লিডার জাতের ফুলকপি আবাদ করেছেন তিনি। পরিচর্যার পর মাত্র ৪৯ দিনেই তাঁর জমিতে ফুলকপি উঠতে শুরু করেছে। এখন ভালো ফলন ও বাজারদরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন এই কৃষক।
ভেড়ামারা উপজেলার ধরমপুর ইউনিয়নের উত্তর ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা নাহিদ (২৬)। তিনি রফিকুল ইসলামের ছেলে। কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ ও লাভের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে আগাম ফুলকপি চাষে নেমেছেন তিনি। তাঁর প্রত্যাশা, বাজারে চাহিদা ও ভালো দাম বজায় থাকলে এই আবাদ থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করা সম্ভব হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, সেচ, নিড়ানি ও রোগবালাই দমন—প্রতিটি ধাপেই নিয়মিত পরিচর্যা করেছেন নাহিদ। আগাম জাতের ফুলকপি চাষে সময়ের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে গাছের বৃদ্ধি ও ফলনের দিকে বিশেষ নজর রাখছেন তিনি। এরই মধ্যে জমিতে ফুলকপি উঠতে শুরু করায় তাঁর প্রত্যাশাও বেড়েছে।
কৃষক নাহিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫০ শতক জমিতে ফুলকপি চাষ করতে এ পর্যন্ত জমি প্রস্তুত, চারা, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বাজারদর অনুকূলে থাকলে এই জমির ফুলকপি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি। সেই হিসাবে অন্যান্য ব্যয় বাদ দেওয়ার আগে সম্ভাব্য আয় থেকে খরচ বাদ দিলে ৫০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা উদ্বৃত্ত থাকতে পারে। তবে প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে ফলন, বাজারদর ও পরবর্তী পরিচর্যার ব্যয়ের ওপর।
নাহিদের এই উদ্যোগে সহায়তা করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। ভেড়ামারার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সদরুল ইসলাম জানান, ভালো দাম ও স্থানীয় বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষকদের মধ্যে আগাম ফুলকপি চাষের আগ্রহ বাড়ছে। এ ধরনের আবাদ লাভজনক হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কৃষি বিভাগ কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, কৃষক নাহিদের ২০ শতক জমিতে আগাম ফুলকপির প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তিনি নিজ উদ্যোগে আরও ৩০ শতক জমিতে একই জাতের ফুলকপি আবাদ করেছেন। সব মিলিয়ে তাঁর আবাদি জমির পরিমাণ ৫০ শতক।
কৃষি কর্মকর্তা সদরুল ইসলামের মতে, উন্নত জাত নির্বাচন, উপযুক্ত সময়ে চারা রোপণ এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে আগাম ফুলকপিতে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। নাহিদের ক্ষেতেও আশাব্যঞ্জক ফলনের প্রত্যাশা করছেন তিনি। কৃষি বিভাগের ধারণা, উৎপাদন ও বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই আবাদ থেকে কৃষক লাভবান হতে পারেন।
কৃষিতে লাভের হিসাব কেবল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; বাজারে কখন পণ্য তোলা হচ্ছে, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকলে কৃষকেরা ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পান। এ কারণেই আগাম ফুলকপি চাষে আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
তরুণ কৃষক নাহিদের ৫০ শতক জমির এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি ফসল উৎপাদনের গল্প নয়; বরং সময়োপযোগী কৃষি পরিকল্পনা ও বাজারের চাহিদা বিবেচনা করে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা। প্রত্যাশিত ফলন ও ন্যায্য দাম পেলে তাঁর এই উদ্যোগ অন্য কৃষকদেরও আগাম সবজি চাষে উৎসাহিত করতে পারে।
এখন নাহিদের সব আশা ফুলকপির ফলন ও বাজারদর ঘিরে। মাঠের পরিশ্রম যেন ঘরে তোলা যায় কাঙ্ক্ষিত আয়ে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা। সঠিক পরিচর্যা, কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং অনুকূল বাজার পরিস্থিতি মিললে আগাম ফুলকপির এই আবাদ তাঁর জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।