প্রভাষক গিয়াস উদ্দিন সরদার, বিশেষ প্রতিনিধি
একসময় বর্ষা শেষে পাবনার ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি চাতালগুলোতে শুরু হতো কর্মব্যস্ততা। নদী, খাল-বিল থেকে আসা দেশি মাছে ভরে উঠত চাতাল। মাছ পরিষ্কার, মাচায় শুকানো ও শুঁটকি তৈরির কাজে দিনভর ব্যস্ত থাকতেন শ্রমিকরা। উৎপাদিত শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে পৌঁছে যেত বিদেশের বাজারেও।
সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দেশি মাছের সংকট, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারসহ নানা কারণে ভাঙ্গুড়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প এখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
উপজেলার অধিকাংশ শুঁটকি চাতাল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা একটি চাতালেও সীমিত পরিসরে চলছে উৎপাদন। পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় কাজের সুযোগ কমেছে শ্রমিকদের। অন্যদিকে মাছ সংগ্রহ করতে না পারায় চাতাল বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
কর্মচাঞ্চল্য হারিয়েছে চাতাল
সম্প্রতি উপজেলার কলকতি এলাকার একটি শুঁটকি চাতালে গিয়ে দেখা যায়, অল্প পরিমাণ মাছ নিয়ে শুকানোর কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক। চাতালের বিস্তীর্ণ জায়গার বড় অংশই ফাঁকা। যেখানে একসময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রমিকদের ব্যস্ততা থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে অনেকটা নীরবতা।
শুঁটকি চাতালের শ্রমিক আসমা খাতুন বলেন, “আগে চাতালে কাজের অভাব ছিল না। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। এখন মাছ না থাকায় অধিকাংশ দিন কাজই থাকে না। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে গেছে।”
শুধু শ্রমিক নন, সংকটে পড়েছেন চাতাল মালিক ও ব্যবসায়ীরাও। মাছ সংগ্রহ করতে না পারায় অনেক ব্যবসায়ীকে চাতাল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে ব্যবসা কমার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে গেছে।
শুঁটকি ব্যবসায়ী রইচ উদ্দিন বলেন, “আগে নিয়মিত মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু চলতি মৌসুমে অনেক ব্যবসায়ী টানা দুই সপ্তাহেও মাছ পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে চাতাল বন্ধ রেখেছেন।”
কমেছে দেশি মাছ
স্থানীয় বাসিন্দা ছালাম আলী ও আল-মাহবুদসহ কয়েকজন জানান, একসময় বর্ষা মৌসুমে চলনবিলসহ ভাঙ্গুড়ার ছোট-বড় বিল পানিতে ভরে উঠত। নদী ও খালের মাধ্যমে মাছ বিভিন্ন জলাশয়ে বিচরণ করত। জেলেরা সেসব জলাশয় থেকে বিপুল পরিমাণ দেশি মাছ আহরণ করতেন। আহরিত মাছের একটি বড় অংশ সরবরাহ করা হতো শুঁটকি চাতালগুলোতে।
তাদের ভাষ্য, একসময় ভাঙ্গুড়ার শুঁটকির আলাদা সুনাম ছিল। স্থানীয়দের দাবি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব শুঁটকি বিদেশের অন্তত ২০টি দেশেও যেত। তবে জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং দেশি মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় সেই জমজমাট ব্যবসায় এখন ভাটা পড়েছে।
একসময় ভাঙ্গুড়া ও চলনবিল অঞ্চলের মুক্ত জলাশয়ে মাগুর, চাপিলা, শিং, পাবদা, টাকি, চিতল, রিটা, গুজি, আইড়, কৈ, বোয়াল, খৈলসা, সরপুঁটি, গজার, বাইম, টাটকিনি, তিতপুঁটি, বাঘাইড়, গুলশা, কাজলি, গাং চেলা, টেংরা, মলা, কালবাউশ ও শোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই আগের মতো সহজলভ্য নয়।
স্থানীয় বাজারগুলোতেও দেশি মাছের সরবরাহ কমেছে। চাষের মাছের উপস্থিতি থাকলেও প্রাকৃতিক জলাশয়ের দেশি মাছের সংকট স্পষ্ট। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশি মাছনির্ভর শুঁটকি শিল্পে।
নিষিদ্ধ জালে বিপন্ন মাছের প্রজনন
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের বিচরণ ও প্রজননের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অপরিকল্পিত বাঁধ, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে অনেক জলাশয়ের পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চায়না দুয়ারি, বাদাই জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর জালের ব্যবহার।
এসব জালে বড় মাছের পাশাপাশি মা মাছ, রেণু ও পোনা মাছও আটকা পড়ছে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কলকতি এলাকার শুঁটকি চাতালের মালিক মো. দুলাল হোসেন বলেন, “দিলপাশার, মাগুড়া, পুঁইবিল, তারাপুর, আদাবাড়িয়া, হাট উধুনিয়া, বাঁশবাড়িয়া, উধুনিয়া, দেখলগ্রাম ও দত্ত খারুয়া বিলে একসময় প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মা মাছসহ সব ধ্বংস করা হচ্ছে। এতে দেশি মাছের উৎপাদন ও প্রজনন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। শুঁটকি উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।”
তিনি বলেন, পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া না গেলে শ্রমিকদের কাজ দেওয়া এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
তিন চাতালের জায়গায় একটি
ভাঙ্গুড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল মোল্লা বলেন, “চায়না দুয়ারিসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে মাছ নিধন এবং বৃষ্টি কম হওয়ায় জলাশয়ে পানি ও মাছ—দুটিই কমেছে। অন্যান্য বছর যেখানে তিনটি শুঁটকি চাতাল ছিল, সেখানে এবার রয়েছে মাত্র একটি।”
তিনি জানান, গত বছর ভাঙ্গুড়ায় প্রায় ৭ টন শুঁটকি উৎপাদন হলেও চলতি বছর ৪ থেকে ৫ টন উৎপাদন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশি ও বিদেশি বাজারে শুঁটকির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু জলাশয়ে পর্যাপ্ত মাছ না থাকলে এ শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন। মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং মৎস্যজীবীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি জানান, চলতি বছর নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে ১৬টি অভিযান পরিচালনা করে ৭০৩টি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল ধ্বংস করা হয়েছে। নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান ও আইন প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে।
ঐতিহ্য টিকবে তো?
ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি শিল্প শুধু একটি ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের কর্মসংস্থান, জীবিকা ও একটি আঞ্চলিক ঐতিহ্য। কিন্তু দেশি মাছের সংকট অব্যাহত থাকলে এ শিল্পের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, জলাশয়ের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ এবং নিয়মিত নজরদারি ছাড়া এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন।
নদী-খাল-বিলের দেশি মাছ ফিরলে হয়তো আবারও কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে ভাঙ্গুড়ার শুঁটকি চাতাল। ফিরতে পারে সেই পুরোনো ব্যস্ততা, কর্মসংস্থান এবং ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্পের সুদিন। এখন সেই অপেক্ষাতেই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।
ছবি: দেশি মাছের সংকটে কর্মচাঞ্চল্য হারিয়েছে পাবনার ভাঙ্গুড়ার কলকতি এলাকার শুঁটকি চাতাল। সীমিত পরিমাণ মাছ নিয়ে শুঁটকি শুকানোর কাজে ব্যস্ত শ্রমিক।