সিংড়ার কৃষি শিক্ষক আব্দুল আজিজের বাগানে থোকায় থোকায় আঙুর, বছরে ৯ লাখ টাকার বিক্রির আশা
মোঃ জাকারিয়া মাসুদ, সিংড়া (নাটোর) প্রতিনিধি:
একসময় বিদেশের আঙুর বাগানের ছবি দেখে মুগ্ধ হতেন। মনে প্রশ্ন জাগত—বাংলাদেশের মাটিতে কি এমন আঙুর ফলানো সম্ভব? সেই কৌতূহল থেকেই শুরু। ইউটিউব দেখে শেখা, নিজের অদম্য আগ্রহ আর নিরলস পরিশ্রমকে পুঁজি করে নাটোরের সিংড়া উপজেলার কৃষি শিক্ষক আব্দুল আজিজ আজ গড়ে তুলেছেন দৃষ্টিনন্দন একটি বাণিজ্যিক আঙুর বাগান। যে বাগান এখন শুধু ফল উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়, বরং আধুনিক কৃষির সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
সিংড়া উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল আজিজ পেশায় একজন কৃষি শিক্ষক। কৃষির প্রতি ভালোবাসা তার বহুদিনের। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নতুন নতুন ফল ও ফসলের চাষ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। এর আগে ড্রাগন ফল, পটল, আপেল কুল ও ভারত কুল চাষ করে সফলতা পেয়েছেন। তবে এবার তিনি বেছে নিয়েছেন এমন একটি ফল, যা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে বিদেশি ফল হিসেবে পরিচিত—আঙুর।
মাত্র নয় মাস আগে বাড়ির পাশের প্রায় এক বিঘা পতিত জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আঙুরের চারা রোপণ করেন তিনি। কোনো বিদেশি প্রশিক্ষণ নয়, কৃষি বিষয়ক বই ও ইউটিউব ভিডিও থেকেই শেখেন চাষাবাদের আধুনিক কৌশল। এরপর নিয়মিত পরিচর্যা, ছাঁটাই, সেচ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গড়ে তোলেন একটি সুপরিকল্পিত আঙুর বাগান।
বর্তমানে তার বাগানে বাইকুনুর, সামার রয়েল, ডিক্সন, গ্রিন লং এবং ব্ল্যাক ম্যাজিক—এই পাঁচটি উন্নত জাতের আঙুর চাষ হচ্ছে। প্রতিটি গাছেই ঝুলছে থোকায় থোকায় রসালো আঙুর। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা বেগুনি ও সবুজ রঙের আঙুরের থোকা যেন এক টুকরো বিদেশি বাগানের অনুভূতি এনে দেয়।
আব্দুল আজিজ জানান, শুরুতে বাড়ির আঙিনায় শখের বসে মাত্র চারটি বাইকুনুর জাতের চারা লাগিয়েছিলেন। পরিচর্যার পর একটি গাছ থেকেই ৭ থেকে ৮ কেজি পর্যন্ত আঙুর উৎপাদিত হয়। সেই সাফল্যই তাকে বড় পরিসরে চাষাবাদে উৎসাহিত করে।
তিনি বলেন, “প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করতে চাইত না যে বাংলাদেশের মাটিতে এত ভালো আঙুর ফলতে পারে। এখন মানুষ নিজের চোখে দেখে অবাক হচ্ছে। আমার বিশ্বাস, সঠিক প্রযুক্তি ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই লাভজনকভাবে আঙুর চাষ সম্ভব। এবার প্রায় ৯ লাখ টাকার আঙুর বিক্রির আশা করছি।”
তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এখন এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষ বাগানটি দেখতে আসছেন। অনেকেই আঙুর চাষের কৌশল জানতে চাইছেন, কেউ আবার তার কাছ থেকেই চারা সংগ্রহ করে নিজ এলাকায় বাগান করার পরিকল্পনা করছেন।
বাগান দেখতে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবে আঙুরের বাগান অনেক দেখেছি। কিন্তু নাটোরের মাটিতে এমন বাগান চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হতো না। এটি আমাদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা।”
স্থানীয়দের মতে, আব্দুল আজিজের এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে ইচ্ছাশক্তি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সঠিক পরিচর্যা থাকলে বিদেশি ফলও দেশের মাটিতে সফলভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ বাড়লে কৃষকরা উচ্চমূল্যের ফল চাষে উৎসাহিত হবেন এবং আমদানিনির্ভরতা কমবে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফরিদ হাসান বলেন, “গত বছরও সিংড়ায় পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বাইকুনুর, সামার রয়েল, ডিক্সন, গ্রিন লং ও ব্ল্যাক ম্যাজিক জাতগুলো আমাদের আবহাওয়ায় আশাব্যঞ্জক ফলন দিয়েছে। কৃষি শিক্ষক আব্দুল আজিজ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। আধুনিক প্রযুক্তি অনুসরণ করলে দেশের বিভিন্ন জেলাতেই বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ সম্ভব।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফল চাষের দিকে ঝুঁকছেন দেশের কৃষকরা। সেই পরিবর্তনের ধারায় আব্দুল আজিজের এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার এক অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত।