কাগজ ডেক্স :
বগুড়ায় দাম্পত্য জীবনের ভাঙন, পারিবারিক অশান্তি ও দীর্ঘদিনের মানসিক হতাশা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিল এক তরুণ ব্যবসায়ীর প্রাণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের জীবনের হতাশা ও কষ্টের কথা তুলে ধরে স্ট্যাটাস দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিষাক্ত ট্যাবলেট সেবন করেন রাহুল যাদব (৩২) নামের এক ব্যবসায়ী। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি বগুড়া শহরে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
নিহত রাহুল যাদব বগুড়া শহরের নামাজগড় ডালপট্টি এলাকার বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ী নিরঞ্জন গোয়ালার একমাত্র ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোগ্যপণ্য ও বিভিন্ন ধরনের ডাল আমদানির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে তিনি একজন পরিচিত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর পরিচিতজনরা।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়েছিল রাহুল যাদবের। দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে। সুখী সংসার গড়ার স্বপ্ন থাকলেও গত কয়েক মাস ধরে তাদের পারিবারিক জীবনে নানা ধরনের অশান্তি চলছিল। একপর্যায়ে তাঁর স্ত্রী অন্য এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে কয়েক মাস আগে স্বামী ও সন্তানকে রেখে ওই যুবককে বিয়ে করেন তিনি।
স্ত্রীর চলে যাওয়ার ঘটনা রাহুল যাদবকে গভীরভাবে আঘাত করে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এরপর থেকেই তিনি মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েন। স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। ব্যবসা-বাণিজ্যেও আগের মতো মনোযোগ দিতে পারছিলেন না। অনেক সময় একা থাকতেন এবং কারও সঙ্গে খুব একটা কথা বলতেন না বলেও জানিয়েছেন স্বজনরা।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের কারণে রাহুলকে প্রায়ই বিষণ্ন দেখা যেত। তবে কেউ কল্পনাও করেননি যে তিনি এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন রাহুল যাদব। সেখানে জীবনের হতাশা, কষ্ট ও মানসিক যন্ত্রণার ইঙ্গিত দিয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি। স্ট্যাটাসটি দেখে তাঁর পরিচিত অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কেউ কেউ ফোনে যোগাযোগের চেষ্টাও করেন। কিন্তু এর কিছু সময়ের মধ্যেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে নিজ বাড়িতে বিষাক্ত ট্যাবলেট সেবন করেন রাহুল যাদব। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসা শুরু করেন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে রাত আনুমানিক ১টার দিকে তিনি মারা যান।
হাসপাতালে রাহুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে শোকের মাতম শুরু হয়। বিশেষ করে তাঁর ছোট মেয়েকে ঘিরে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একমাত্র সন্তানকে বুকে জড়িয়ে স্বজনদের কান্নায় হাসপাতাল এলাকাও ভারী হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুল্লাহ আল সাদিক জানান, ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সমাজসচেতন মহল বলছেন, বর্তমানে পারিবারিক ভাঙন, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও মানসিক চাপের কারণে অনেক মানুষ চরম হতাশায় ভুগছেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা বা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার ও কাছের মানুষের সহানুভূতি এবং সময়মতো মানসিক সহায়তা পেলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
রাহুল যাদবের আকস্মিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল—মানসিক কষ্ট অনেক সময় নীরবে মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। তাই হতাশাগ্রস্ত মানুষদের প্রতি পরিবার, বন্ধু ও সমাজের আরও বেশি সহমর্মী হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।