মোঃ শিহাব উদ্দিন, গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি:
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় শোক, আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে গাজীপুর ও গোপালগঞ্জজুড়ে। হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় নিহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কেএম বাবর। তিনি নিহতদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দেন, তাদের খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের যোগ্য সদস্যদের চাকরির ব্যবস্থা করার আশ্বাস প্রদান করেন।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামে নিহত শারমিন আক্তারের বাড়িতে যান এমপি ডা. কেএম বাবর। এ সময় বাড়ির চারপাশে উৎসুক জনতার ভিড় দেখা যায়। স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে। গ্রামের মানুষজনও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
এমপি ডা. কেএম বাবর নিহত শারমিন আক্তারের বাবা শাহাদাত মোল্লা চৌকিদারের সঙ্গে কথা বলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। তিনি বলেন,
“এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একটি পরিবারের প্রায় সবাইকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিবারের পাশে আছি। পরিবারের যোগ্য সদস্য থাকলে তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে কিছুটা হলেও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, সমাজে পারিবারিক সহিংসতা ও অপরাধ দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
এ সময় জেলা ও উপজেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং এলাকাবাসীও নিহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত শারমিন আক্তার দীর্ঘদিন ধরে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় বসবাস করতেন। পরিবারের সদস্যরা সাধারণ জীবনযাপন করলেও তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ ছিল বলে দাবি করেছেন কয়েকজন স্বজন। তবে কী কারণে এত বড় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো, তা নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।
উল্লেখ্য, গত ১০ মে গভীর রাতে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার একটি বাড়ি থেকে শারমিন আক্তার (৩৫), তাঁর তিন সন্তান মিম আক্তার (১৫), মারিয়া (১২), ফারিয়া (১) এবং ভাই রসুল হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের গলা কাটা অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই এলাকায় চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত মিম স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। মারিয়াও স্কুলে পড়াশোনা করত। সবচেয়ে ছোট সন্তান ফারিয়ার বয়স ছিল মাত্র এক বছর। একই পরিবারের এতগুলো প্রাণ একসঙ্গে ঝরে যাওয়ায় শোকে ভেঙে পড়েছেন স্বজনরা। প্রতিবেশীদের অনেকেই জানান, ছোট্ট ফারিয়ার মৃত্যু সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে সবাইকে।
নিহত শারমিন আক্তার গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শাহাদাত মোল্লা চৌকিদারের মেয়ে। জীবিকার তাগিদে বহু বছর আগে তিনি স্বামীর সঙ্গে গাজীপুরে চলে যান। পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করলেও গ্রামের বাড়ির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল নিয়মিত।
ঘটনার পর থেকেই শারমিনের স্বামী ফোরকান মিয়া পলাতক রয়েছেন। পুলিশ ও স্বজনদের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক কলহের জেরে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পালিয়ে গেছেন। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এছাড়া প্রযুক্তির সহায়তায় পলাতক সন্দেহভাজনকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসীর মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয়রা দ্রুত রহস্য উদঘাটন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিবার ও সমাজে সহিংসতা প্রতিরোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
গ্রামের প্রবীণরা বলছেন, একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্যকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, পুরো সমাজের জন্যই গভীর উদ্বেগের বিষয়। তারা মনে করেন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও পারিবারিক অস্থিরতা বাড়তে থাকায় এ ধরনের অপরাধও বাড়ছে।
নিহত পরিবারের বাড়িতে এখনও চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের চোখের পানি যেন থামছেই না। গ্রামের মানুষজনও বারবার সেখানে ভিড় করছেন, সমবেদনা জানাচ্ছেন এবং এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার দাবি করছেন।