ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার উধুনিয়া ইউনিয়নের প্রায় ৫ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এখন এলাকাবাসীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে থাকা এই সড়কের কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অন্তত ১০ গ্রামের হাজারো মানুষকে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও স্বাভাবিক যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই এই সড়ক হয়ে উঠেছে দুর্ভোগের প্রতীক। আর এই অবহেলার নির্মম শিকার হয়েছেন অন্তঃসত্ত্বা আতিয়া খাতুন, যার মৃত্যু আজও কাঁদায় পুরো এলাকাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক দশক আগে প্রসব ব্যথা ওঠার পর আতিয়াকে ভ্যানে করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু মাত্র ৫ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পেরোতে সময় লেগে যায় প্রায় তিন ঘণ্টা। কাদা আর ভাঙাচোরা পথে ভ্যান ঠেলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।
মেয়ের মৃত্যুর সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি মনে করে এখনও কান্নায় ভেঙে পড়েন আতিয়ার বাবা আকবর আলী। তিনি বলেন,
“পার্শ্ববর্তী ভাঙ্গুড়া সীমান্তের কাছে আমাদের বাড়ি। সুবৈদ্যমরিচ, বাগমারা বাজার হয়ে উধুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত পুরো রাস্তা কাদায় ভরা ছিল। কয়েকজন মিলে ভ্যান ঠেলেও মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। এই কষ্ট কোনোদিন ভুলতে পারব না।”
শুধু আতিয়া নন, স্থানীয়দের দাবি—স্বাধীনতার পর থেকে এই সড়ক পাকা না হওয়ায় বহু রোগী, গর্ভবতী নারী ও সাধারণ মানুষ সময়মতো চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বর্ষা মৌসুমে সড়কটি চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উধুনিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলের বাগমারা, বেতকান্দি, বগুড়া, সুবৈদ্যমরিচ, মন্ডমালা, গজাইল, দিঘলসহ অন্তত ১০ গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই সড়ক। অথচ স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এখানে গড়ে ওঠেনি কোনো টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা।
এ সড়কের পাশেই রয়েছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি দাখিল মাদ্রাসা, কলেজ এবং ঐতিহ্যবাহী বাগমারা হাট। এছাড়া ১০ গ্রামের মানুষের একমাত্র কবরস্থানও এই পথের পাশে অবস্থিত। ফলে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক ও ব্যবসায়ীকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা খাদেম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আটটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। প্রতিবারই নেতারা রাস্তা পাকা করার প্রতিশ্রুতি দেন। ভোট শেষ হলেই সবাই ভুলে যান। আমাদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই।”
সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কৃষক আবুল হোসেন ও সোনাই লাল জানান, কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হচ্ছে। অনেক সময় সময়মতো বাজারে পৌঁছাতে না পারায় ন্যায্য মূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
বাগমারা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বলেন,
“এই সড়ক দিয়ে ১০ গ্রামের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত করতে হয়। বর্ষায় কাদা আর গ্রীষ্মে ধুলাবালির কারণে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা পাকা হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি এখনও অবহেলিত।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী শহিদুল্লাহ জানান,
“মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা জানি। সড়কটি পাকাকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন,
“আমি নতুন যোগদান করেছি। এলাকাবাসী লিখিত আবেদন করলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
এদিকে দীর্ঘদিনের এই অবহেলার অবসান চেয়ে দ্রুত সড়কটি পাকাকরণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের ভাষ্য—আর যেন কোনো আতিয়াকে প্রাণ দিতে না হয় অবহেলিত এই কাঁচা সড়কের কারণে।