শাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী, সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ছোট সাদিপুর এলাকায় পূর্ব বিরোধের জেরে এক পরিবারের সদস্যদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলা, নারীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা, স্বর্ণালংকার ছিনতাই এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় আহত নারী, শিশু ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী আব্দুল বাছেদ (৫৫) গত ৪ জুন সোনারগাঁ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে আনোয়ার হোসেন (৫৫), নূরজাহান (৪০), পারুল (৫৮), মাসুম (৪০), আব্দুর রাজ্জাক (৫৫) ও জিয়াসমিন (৪৫)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২ থেকে ৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২ জুন রাত আনুমানিক ৮টা ৪৫ মিনিটে অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে দেশীয় অস্ত্র, কাঠের লাঠি ও এসএস পাইপ নিয়ে আব্দুল বাছেদের বাড়ির সামনে এসে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। একপর্যায়ে বাড়ির সদস্যরা এর প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রথমে আব্দুল বাছেদের স্ত্রীর বড় বোন শাহানাজ আক্তার (৪০) প্রতিবাদ জানালে অভিযুক্তরা তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তাকে দেশীয় অস্ত্র, কাঠের লাঠি ও এসএস পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
শাহানাজ আক্তারের চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন রিনা আক্তার (৩৮) এবং তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে রাফি। অভিযোগে বলা হয়, তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। রিনাকে মারধর করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং রাফিকেও বেধড়ক পিটিয়ে আহত করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলার একপর্যায়ে রিনা আক্তার মাটিতে পড়ে গেলে অভিযুক্ত মাসুম তার পরনের কাপড় টানাহেঁচড়া করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন এবং বুকের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। এ সময় ছেলে রাফি মাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন এসএস পাইপ দিয়ে তার মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করেন। আত্মরক্ষার্থে হাত দিয়ে আঘাত ঠেকাতে গেলে রাফির বাম হাতে গুরুতর জখম হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলার সুযোগে অভিযুক্ত পারুল রিনা আক্তারের গলায় থাকা প্রায় দেড় ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ লাখ টাকা। একই সময়ে নূরজাহান শাহানাজ আক্তারের গলায় থাকা প্রায় এক ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেন, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা।
লিখিত অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, আনোয়ার হোসেন ও আব্দুর রাজ্জাক শাহানাজ আক্তারকে মাটিতে ফেলে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। এ সময় পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে শুরু করলে অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। যাওয়ার আগে তারা আইনের আশ্রয় নিলে পুরো পরিবারকে প্রাণে হত্যা করার হুমকি দেয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার পর আহত শাহানাজ আক্তার, রিনা আক্তার ও রাফিকে উদ্ধার করে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে ভুক্তভোগী পরিবার থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
ভুক্তভোগী আব্দুল বাছেদ বলেন, “এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত হামলা। আমার স্ত্রী, শ্যালিকা ও ছেলেকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে। নারীদের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে এবং তাদের গলায় থাকা স্বর্ণালংকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।”
তিনি আরও দাবি করেন, অভিযুক্তদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। এর আগে চুরি, হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ওই মামলাগুলোকে কেন্দ্র করেই অভিযুক্তরা ক্ষুব্ধ ছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছিল। সর্বশেষ হামলার ঘটনাটিও সেই বিরোধেরই ধারাবাহিকতা বলে তাদের দাবি।
ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, অভিযুক্ত নূরজাহানের বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম সারোয়ার বলেন, “ঘটনার বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।