মোঃ মাসুদ রানা, বিশেষ প্রতিনিধি:
মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য খাগদী এলাকার যুবক রফিকুল ইসলাম রাব্বিকে ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় জিম্মি করে নির্যাতন চালিয়ে ৮৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। পরিবারের দাবি, বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের পরও রফিকুলকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বরং গত এক সপ্তাহ ধরে তার কোনো সন্ধান মিলছে না।
স্বজনরা জানান, প্রায় দুই বছর আগে সংসারের অভাব দূর করতে ইতালিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন রফিকুল ইসলাম রাব্বি। কিন্তু ইতালিতে না পাঠিয়ে তাকে লিবিয়ায় নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে জিম্মি করা হয়। সেখানে অমানবিক নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ছেলেকে নির্যাতনের সেই মর্মান্তিক ভিডিও দেখে গভীর মানসিক আঘাতে দেড় বছর আগে বাবা জলিল বেপারী এবং ছয় মাস আগে মা মেহেরুন নেছা মারা যান। এরপরও দফায় দফায় ভিটেমাটি বিক্রি ও উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে মোট ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে বাধ্য হয় পরিবার। কিন্তু আজও রফিকুলের মুক্তি মেলেনি। বরং এক সপ্তাহ ধরে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে রফিকুলের স্বজন ও এলাকাবাসী অভিযুক্ত দালালদের বাড়িতে গিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। তবে অভিযুক্তদের কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো জবাব পাননি বলে অভিযোগ করেন তারা।
পরিবারের দাবি, সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের তালতলা এলাকার আয়ুব আলী মাতুব্বরের ছেলে রিয়াজুল মাতুব্বর, তার শ্বশুর মধ্য খাগদী এলাকার জামাল ফকির এবং শাশুড়ি রোমানা বেগম বিদেশে পাঠানোর নামে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেন। পরে ইতালির পরিবর্তে রফিকুলকে লিবিয়ায় পাঠিয়ে জিম্মি করে নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
রফিকুল তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। বর্তমানে ঋণের বোঝা, পাওনাদারদের চাপ এবং রফিকুলের নিখোঁজ থাকার কারণে পরিবারটি চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
রফিকুলের বড় ভাই তানজিলা আক্তার বলেন, “আমার ভাইকে জিম্মি করে ৮৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে। তারপরও তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। আমরা প্রশাসনের কাছে ভাইকে দ্রুত উদ্ধার এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।”
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বেপারী বলেন, “বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগ এই চক্রের বিরুদ্ধে নতুন নয়। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক পরিবার একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
অন্যদিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত রোমানা বেগম। তিনি বলেন, “রফিকুল কবে, কার মাধ্যমে বা কোথায় গেছেন, সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। টাকার কোনো লেনদেন সম্পর্কেও আমার জানা নেই। আমার জামাতা রিয়াজুল মাতুব্বর ইতালিতে অবস্থান করছেন এবং আমার স্বামী কালকিনি উপজেলায় কাজে রয়েছেন।”
ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। রফিকুলের স্বজনরা মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, রফিকুলকে জীবিত উদ্ধার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।