শিরোনাম
ভাঙ্গুড়া থেকে অসুস্থ গরু কিনে মাংস বিক্রির চেষ্টা, ফরিদপুরে দুজন আটক ময়মনসিংহে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভা কয়রার ফতেকাটি মাদ্রাসা এখন এলাকার গর্ব সোনারগাঁওয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযান, আটক ৯; ইয়াবা ও হেরোইন উদ্ধার দুই বছর ধরে বন্ধ অটিজম স্কুল, থমকে আছে ১০৮ শিশুর শিক্ষা চুয়াডাঙ্গায় আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা অনুষ্ঠিত  নাসিরনগরে ফারমার্স মিনি কোল্ড স্টোরেজ এর শুভ উদ্বোধন  তাড়াশ মহিলা ডিগ্রি কলেজে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান সিরাজগঞ্জের তাড়াশে দেশীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে হাফিজুর রহমানের জীবন বৃত্তান্ত ও রাজনৈতিক পরিচিতি তানোর-মোহনপুর সড়ক এখন মরণফাঁদ খানাখন্দে বেহাল দশা, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা—ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের
শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৪ পূর্বাহ্ন

দুই বছর ধরে বন্ধ অটিজম স্কুল, থমকে আছে ১০৮ শিশুর শিক্ষা

প্রতিবেদকের নাম / ১৪ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

ফিরোজ আল আমিন

নিজস্ব প্রতিনিধি:

একটি শ্রেণিকক্ষ। সেখানে একসঙ্গে চলত পড়াশোনা, আচরণগত প্রশিক্ষণ, সামাজিক যোগাযোগ ও মানসিক বিকাশের অনুশীলন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য সেই জায়গাটিই ছিল শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। কিন্তু সেই দরজাই এখন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বেলকুচি অটিজম স্কুল’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বন্ধ রয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের ১০৮ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ২০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পরও এর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—কেন বন্ধ হলো স্কুলটি, কোথায় আটকে আছে পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া এবং কবে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরবে শিশুরা?

২০১৪ সালে যাত্রা, ২০২৪-এ থেমে গেল

স্থানীয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৪ সালে বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হয় এলাকার বহু পরিবার।

অভিভাবকদের কাছে স্কুলটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য এটি ছিল সামাজিক পরিবেশে থাকার অন্যতম সুযোগ। শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে শিশুরা পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও আচরণগত দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেত।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করেই বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর শ্রেণিকক্ষে ফেরেনি শিক্ষার্থীরা।

‘স্কুল বন্ধ, সন্তানও ঘরবন্দী’

অভিভাবকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিশু এখন দিনের অধিকাংশ সময় বাড়িতেই কাটাচ্ছে। ফলে তাদের নিয়মিত পড়াশোনা, সামাজিক যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা কতটা ক্ষতিকর হতে পারে—এ নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা। তাদের দাবি, সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিকল্প হিসেবে যে বিশেষায়িত বিদ্যালয়টি তাদের সন্তানদের জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।

একাধিক অভিভাবকের ভাষ্য, স্কুল চালু থাকাকালে সন্তানদের মধ্যে নিয়মিততা তৈরি হয়েছিল। শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগও ছিল। এখন স্কুল বন্ধ থাকায় সেই পরিবেশ আর নেই।

তাহলে বন্ধের কারণ কী?

বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে সামনে এসেছে প্রশাসনিক ও আর্থিক নানা জটিলতার বিষয়।

বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্কুলটি পরিচালিত হওয়ায় ভবন ব্যবহারের বিষয়টি ইউনিয়ন পরিষদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম জানান, নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কক্ষ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশনা পাওয়ার পর শিক্ষা উপকরণ সরিয়ে নিতে বাধ্য হন তারা। এরপর থেকে আর শুরু হয়নি বিদ্যালয়ের কার্যক্রম।

এখানেই সামনে আসে মূল প্রশ্ন—একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করেই কেন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেল?

বকেয়া বিদ্যুৎ বিলও ছিল আলোচনায়

বেলকুচি সদর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ফয়সাল আহমেদ জানান, স্কুল চলাকালীন বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছিল। স্কুল বন্ধ হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে প্রায় ১৮ মাসের বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এই তথ্য থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়—প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দায়বদ্ধতার বিষয়টিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তবে বকেয়া বিল পরিশোধের পরও কেন বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা গেল না, তার সুস্পষ্ট সমাধান এখনো মেলেনি বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

তদন্ত হয়েছে, সিদ্ধান্ত কোথায়?

বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার বিষয়টি প্রশাসনেরও নজরে এসেছে। বেলকুচি পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফরিন জাহান জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তদন্ত প্রতিবেদন চাওয়া হলে সরেজমিনে তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কিন্তু তদন্তের পরও বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় এখন অভিভাবকদের প্রশ্ন—তদন্তের সুপারিশ কী ছিল? সেই সুপারিশের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য আর কত সময় লাগবে?

পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের হাতে

ইউএনও আফরিন জাহান জানান, বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর বিষয়টি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য বিদ্যালয়টি অনুমোদনের লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।

অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ে তদন্ত ও উদ্যোগের পর বিষয়টি এখন কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সময় পার হচ্ছে—আর শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারছে না ১০৮ শিশু।

২০ শিক্ষক-কর্মচারীরও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, বিদ্যালয়টি বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন ২০ জন শিক্ষক ও কর্মচারী। প্রধান শিক্ষক জাহিদুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তারা কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন।

একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সাধারণত শুধু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমই থেমে যায় না; এর সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক, কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের জীবন-জীবিকাও প্রভাবিত হয়। বেলকুচির অটিজম স্কুলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

অপেক্ষা শুধু একটি সিদ্ধান্তের

বেলকুচির এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখন ১০৮ শিশুকে ঘিরে। তারা কবে আবার স্কুলে ফিরবে? কবে ফিরে পাবে শিক্ষক, সহপাঠী ও নিয়মিত শিক্ষার পরিবেশ?

প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা চলছেই। কিন্তু বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে সময়ের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ বিরতির কারণে তাদের শিক্ষা ও সামাজিক বিকাশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা পূরণ করা কতটা সম্ভব—এ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে।

স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন করে বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন।

তাদের প্রত্যাশা, তদন্ত, চিঠিপত্র ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া যেন আর দীর্ঘসূত্রতায় না পড়ে। কারণ বিষয়টি কেবল একটি স্কুল খোলার নয়—এটি ১০৮ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর শিক্ষা, সামাজিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
01 October 2026

দুই বছর ধরে বন্ধ অটিজম স্কুল, থমকে আছে ১০৮ শিশুর শিক্ষা

www.dainikkagoj.com
01 October 2026

দুই বছর ধরে বন্ধ অটিজম স্কুল, থমকে আছে ১০৮ শিশুর শিক্ষা

www.dainikkagoj.com