নুরুল কবির, সাতকানিয়া প্রতিনিধি:
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ডলু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচে পৌর এলাকায় প্রবেশ করায় আদালত চত্বর, উপজেলা পরিষদ, সরকারি দপ্তর, সড়ক ও আবাসিক এলাকাসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে সাতকানিয়া আদালত ভবনে হাঁটুসমান পানি জমে যাওয়ায় বুধবার বিচারিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সাতকানিয়া আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এডিশনাল জিপি) মো. রাশেদুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আদালত চত্বর ও বিভিন্ন কক্ষে পানি প্রবেশ করায় বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, বিচারক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও মালামাল রক্ষার স্বার্থে যৌথ জেলা জজ আদালত এবং সাতকানিয়া চৌকি আদালতের বিচারিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আদালতের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। পানি নেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই আদালতের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ডলু নদীর পানি বেড়ে সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদ চত্বরও প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। পরিষদ মাঠের বিস্তীর্ণ অংশ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে যাতায়াত এবং বিভিন্ন সেবা নিতে আসা মানুষের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা পরিষদসংলগ্ন সড়কেও পানি উঠে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলে সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে ডলু নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে নদীর পানি প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচে পৌরসভার বিভিন্ন সড়ক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়ে। এতে বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।
আদালতে মামলার তারিখ থাকায় বুধবার সকাল থেকেই বিভিন্ন এলাকা থেকে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও সেবাপ্রার্থীরা আদালত প্রাঙ্গণে আসতে শুরু করেন। কিন্তু আদালত ভবনে পানি জমে থাকায় বিচারিক কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা শুনে অনেকেই ফিরে যেতে বাধ্য হন। এতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির আইসিটি সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন বলেন, মঙ্গলবার রাত থেকেই বন্যার পানি আদালত ভবনে প্রবেশ করতে শুরু করে। রাতের মধ্যে আদালত চত্বর ও বিভিন্ন কক্ষ পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে বুধবার আদালতের সব ধরনের বিচারিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সাতকানিয়া আদালত টিনঘেরা অস্থায়ী কাঠামোতে পরিচালিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলেই আদালতের কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ঝুঁকির মুখে পড়ে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও সাতকানিয়ার মানুষের জন্য একটি আধুনিক ও স্থায়ী আদালত ভবন নির্মাণ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি দ্রুত একটি যুগোপযোগী, টেকসই ও পূর্ণাঙ্গ আদালত ভবন নির্মাণে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি উদ্যোগ কামনা করেন।
এদিকে বন্যার পানি বাড়তে থাকায় সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। অনেক সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর ও জনসেবামূলক কার্যক্রমও বন্যার কারণে ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। পানি নেমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আদালতের বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট এ বন্যায় সাতকানিয়ার মানুষের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। দ্রুত পানি না কমলে জনজীবনের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমেও আরও বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।