ফিরোজ আল আমিন
কলামিস্ট ও সাংবাদিক :
রাজনীতি আর সাংবাদিকতা—দুটি পেশা, দুটি দায়িত্ব, দুটি ভিন্ন পথ। একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ক্ষমতা অর্জন ও প্রয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, অন্যটি ক্ষমতার ব্যবহারকে জনস্বার্থের আলোকে যাচাই-বাছাই করে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করে। গণতান্ত্রিক সমাজে এই দুই ক্ষেত্রের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও তাদের ভূমিকা, লক্ষ্য ও জবাবদিহিতার জায়গা এক নয়।
রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন, জনসমর্থন সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট আদর্শ বা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। রাজনৈতিক দল ও নেতারা জনগণের ভোট, সমর্থন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে রাজনীতিতে কৌশল, প্রচারণা, জনপ্রিয়তা অর্জন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবে জড়িত থাকে। সহজভাবে বললে, রাজনীতি হলো ক্ষমতার বৈধ ব্যবহারের জন্য প্রতিযোগিতা ও সংগ্রামের একটি প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে সাংবাদিকতার লক্ষ্য ক্ষমতা অর্জন নয়, বরং ক্ষমতার ব্যবহারের ওপর নজরদারি করা। একজন সাংবাদিকের প্রধান দায়িত্ব হলো তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরা। তিনি সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা যেকোনো প্রভাবশালী শক্তির কর্মকাণ্ডকে প্রশ্ন করার অধিকার ও দায়িত্ব রাখেন। কারণ গণমাধ্যমকে প্রায়ই গণতন্ত্রের “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয়, যার কাজ হলো জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন সাংবাদিকতা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ থাকে, তখন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে এমন বহু তথ্য উন্মোচিত হয়েছে, যা সরকার, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর গোপন অপকর্মকে জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। এই ভূমিকা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী যদি সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্বে থাকেন, তাহলে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে কোনো সাংবাদিক যদি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠেন, তাহলে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংবাদ তখন তথ্য নয়, প্রচারণায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
আধুনিক বিশ্বে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মতামত, প্রচারণা ও সংবাদ একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সত্য ও বিভ্রান্তির পার্থক্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় পেশাদার সাংবাদিকতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। কারণ যাচাইকৃত তথ্য এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনই পারে সমাজকে গুজব ও অপপ্রচার থেকে রক্ষা করতে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক উভয়েরই প্রয়োজন রয়েছে। রাজনীতিবিদরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, আর সাংবাদিকরা সেই পরিচালনার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণ করেন। এক পক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়, অন্য পক্ষ সেই সিদ্ধান্তের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করে। তাই তাদের মধ্যে দূরত্ব নয়, বরং দায়িত্বের স্বচ্ছ বিভাজন থাকা জরুরি।
আজকের বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও পেশাগত সততা রক্ষা করা। সংবাদমাধ্যম যদি ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত থেকে সত্য প্রকাশ করতে পারে, তাহলে জনগণ উপকৃত হবে এবং গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। আর রাজনীতি যদি জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।
সুতরাং, রাজনীতি ক্ষমতার সংগ্রাম হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতা অবশ্যই সত্যের সংগ্রাম। ক্ষমতা পরিবর্তনশীল, কিন্তু সত্যের প্রয়োজন চিরন্তন। যে সমাজে সাংবাদিকতা স্বাধীন থাকে, সেই সমাজেই গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় হয় এবং জনগণের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।