ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা বৃষ্টির প্রভাবে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি নতুন করে বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। গত কয়েকদিনের ওঠানামার পর গত ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে যমুনার অভ্যন্তরীণ বেশ কয়েকটি নিচু চরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। ফলে কৃষিজমি, গবাদিপশু এবং বসতভিটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নদীপাড়ের হাজার হাজার মানুষ।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্ট এলাকায় ৩২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে কাজীপুর উপজেলার মেঘাইঘাট পয়েন্টে পানি বেড়েছে ৩৬ সেন্টিমিটার।
পাউবোর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত ১৪ মে থেকে যমুনা নদীর পানি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর মধ্যে ১৬ মে ৫ সেন্টিমিটার, ১৭ মে ৫ সেন্টিমিটার, ১৮ মে ৬ সেন্টিমিটার, ১৯ মে ২৭ সেন্টিমিটার, ২০ মে ১০ সেন্টিমিটার, ২৩ মে ২১ সেন্টিমিটার, ২৪ মে ২৮ সেন্টিমিটার, ২৫ মে ২৩ সেন্টিমিটার এবং ২৬ মে ২৬ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীতে কিছুদিন পানি কমলেও আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। ২৯ মে ১১ সেন্টিমিটার এবং ৩০ মে ২ সেন্টিমিটার পানি কমলেও ৩১ মে ২০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পায়। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩২ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যমুনার চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ইতোমধ্যেই সম্ভাব্য বন্যার আশঙ্কায় সতর্ক হতে শুরু করেছেন। অনেক কৃষক নদী তীরবর্তী জমি থেকে আগাম ফসল কেটে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজও শুরু হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, “উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভারি বর্ষণের কারণে যমুনা নদীর পানি কখনো বাড়ছে আবার কখনো কমছে। তবে বর্তমানে নদীর পানি বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জুন, জুলাই ও আগস্ট মূলত বর্ষা মৌসুম হওয়ায় এ সময়ে যমুনার পানি বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা।”
তিনি আরও বলেন, “পানি দ্রুত বাড়লেও বর্তমানে তা বিপদসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ড পয়েন্ট এলাকায় পানি এখনো বিপদসীমার ২৯৩ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। অন্যদিকে কাজীপুরের মেঘাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ৩৪৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে বন্যার আশঙ্কা না থাকলেও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
এদিকে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের নিম্নভূমি ও চাষযোগ্য জমিতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে কাজীপুর, চৌহালী, শাহজাদপুর ও বেলকুচি উপজেলার নদীসংলগ্ন চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পানি বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, যমুনা নদীর পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী জনগণকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পানি বৃদ্ধির এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢল ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। তবে চলতি মৌসুমের শুরুতেই পানি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় নদীতীরবর্তী জনপদের মানুষের মধ্যে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আগামী কয়েক সপ্তাহ যমুনা নদীর পানি প্রবাহের ওপর বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।