কাগজ ডেক্স:
চট্টগ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে নিজস্ব আলো ছড়িয়ে দেওয়া এক উজ্জ্বল নাম শাম্মী তুলতুল। সমকালীন বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই লেখক আজ পাঠকমহলে একজন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হিসেবে সুপরিচিত। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম—তিন ক্ষেত্রেই তিনি রেখে চলেছেন তাঁর স্বতন্ত্র পদচিহ্ন।
ঐতিহ্যবাহী পরিবারে বেড়ে ওঠা
শাম্মী তুলতুল জন্মগ্রহণ করেন একটি সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। তাঁর দাদা আব্দুল কুদ্দুস মাস্টার ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় নেতা, লেখক এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যবন্ধু। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের সূচনা।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত, চঞ্চল ও সৃজনশীল। নাচ, গান, আবৃত্তি, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ছিল তাঁর সমান আগ্রহ। তবে সময়ের পরিক্রমায় লেখালেখিই হয়ে ওঠে তাঁর মূল পরিচয় এবং আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
বহুমাত্রিক সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব
বর্তমানে শাম্মী তুলতুল একাধারে লেখক, উপন্যাসিক, গল্পকার, শিশুসাহিত্যিক, নজরুল অনুরাগী, রেডিও অনুষ্ঠান পরিচালক, সংবাদ পাঠিকা, সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট, ভয়েস প্রেজেন্টার, দাবাড়ু ও মডেল। তাঁর এই বহুমাত্রিক পরিচয় সৃষ্টিশীলতার বিস্তৃত পরিসরকে তুলে ধরে।
সাহিত্যজীবনের সাফল্য
এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৬টি। ২০২২ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘নরকে আলিঙ্গন’ পাঠকমহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বইটি বর্তমানে ভারতের জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্টেও পাওয়া যাচ্ছে।
তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
চোরাবালির বাসিন্দা
পদ্মবু
মনজুয়াড়ি
এসব গ্রন্থ পাঠকমহলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে বেস্টসেলার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষণীয় ও মানবিক বার্তা তুলে ধরা। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্ম কেবল গল্প বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজ সচেতনতা ও মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
শিশু-কিশোর সাহিত্যে বিশেষ অবদান
শিশু-কিশোর সাহিত্যে শাম্মী তুলতুলের অবদানও উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচিত ‘পিঁপড়ে ও হাতির যুদ্ধ’ গল্পটি দীপ্ত টিভিতে নাট্যরূপে প্রচারিত হয়েছে। এছাড়া তাঁর গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘লাল শরবত’ নাটক সম্প্রচারিত হয়েছে সিটি এফএম-এ।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর একটি গল্প ভারতে গবেষণার কাজে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাঁর সাহিত্যকর্মের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবের পরিচয় মিলেছে। তিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষা উন্নয়ন সংস্থা Room to Read Bangladesh-এর এনলিস্টেড লেখিকা হিসেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেছেন।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা
সাহিত্য ও সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ড
মহাত্মা গান্ধী পিস অ্যাওয়ার্ড
সাউথ এশিয়া গোল্ডেন পিস অ্যাওয়ার্ড
নজরুল অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার
সোনার বাংলা সাহিত্য সম্মাননা
রোটারি সম্মাননা
উইমেন পাওয়ার লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড ২০২৫
ময়ূরপঙ্খী স্টার অ্যাওয়ার্ড ২০২৫
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সম্মাননা
এছাড়াও খাগড়াছড়ির পাঠকসমাজ ভালোবেসে তাঁকে ‘রাজকন্যা’ উপাধিতে ভূষিত করেছে।
গণমাধ্যম ও মডেলিংয়ে সক্রিয় উপস্থিতি
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি গণমাধ্যমেও রয়েছে তাঁর সরব উপস্থিতি। তিনি নিয়মিত রেডিওতে সংবাদ পাঠ করেন এবং বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন। সম্প্রতি তিনি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার চরিত্রে একটি ম্যাগাজিনের কভার মডেল হিসেবে অংশ নিয়ে নতুনভাবে আলোচনায় আসেন।
সংগ্রাম, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক
সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন শাম্মী তুলতুল। তাঁর জীবনসংগ্রাম নারীর আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও অদম্য মানসিক শক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর লেখনীতে প্রতিফলিত হয় সমাজ-বাস্তবতা, মানবিক মূল্যবোধ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন,
“লেখালেখি আমার কাছে শুধু একটি পেশা নয়, এটি একটি দায়বদ্ধতা। মানুষের হৃদয়ে আলো পৌঁছে দেওয়ার এক অবিরাম প্রয়াস। আমি বিশ্বাস করি, সাহিত্য মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখাতে পারে। জনপ্রিয়তার চেয়ে পাঠকের চিন্তা ও জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
উপসংহার
সব মিলিয়ে শাম্মী তুলতুল কেবল একজন লেখক নন; তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা ও অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর কলমে উঠে আসে মানুষের জীবন, সমাজের বাস্তবতা, মানবিকতা এবং স্বপ্নের গল্প। দুই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর অবদান ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, আর তাঁর সৃষ্টিশীল যাত্রা ভবিষ্যতে বাংলা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে—এমন প্রত্যাশাই পাঠকসমাজের।