মোঃ হাচান আল মামুন, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি) প্রতিনিধি
এক পাশে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত, অন্য পাশে সবুজে ঘেরা পাহাড় আর বুক চিরে বয়ে চলা মাইনি নদী। সেই নদীর উল্টো স্রোত ঠেলে, দুর্গম পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে প্রতিদিন এগিয়ে চলে একদল সীমান্তরক্ষীর জীবনসংগ্রাম। তাদের গন্তব্য—পূর্ব লঙ্কাছড়া সীমান্ত এলাকা।
দীঘিনালা উপজেলা-এর ৫নং বাবুছড়া ইউনিয়নের নির্মাণাধীন সড়ক ধরে ধনপাতাছড়া ঘাট থেকে শুরু হয় এই দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। এরপর মাইনি নদীর নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে শুন্যরেখা ঘেঁষে আড়ান্দিছড়া, টেক্কাছড়া, শীলছড়া, উত্তর শীলছড়া ও লঙ্কাছড়া হয়ে পৌঁছাতে হয় পূর্ব লঙ্কাছড়ায়। পুরো পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ দিন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এ অঞ্চল যেন মেঘের রাজ্য। সেখানে পৌঁছাতে কখনো ১০ ঘণ্টার নৌভ্রমণ, আবার কখনো ৩০ থেকে ৩২ ঘণ্টার টানা পাহাড়ি পথ হেঁটে চলতে হয়। অধিকাংশ পথেই নেই কোনো রাস্তা কিংবা জনবসতি। কেবল সীমান্তরক্ষীদের চলাচলের সুবিধার্থে তৈরি করা সরু পথই তাদের একমাত্র ভরসা।
উঁচু-নিচু পাহাড়, গভীর পিচ্ছিল ঝিরি আর বিপজ্জনক খাড়া ঢাল বেয়ে এগিয়ে চলতে হাতে থাকা লাঠিই হয়ে ওঠে সহযাত্রী। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটার পর কোনো এক মিড পয়েন্টে সামান্য বিশ্রাম, তারপর আবার শুরু হয় নতুন পথচলা। পাহাড় পেরিয়ে, ছড়া অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় লঙ্কাছড়া বিওপিতে। সেখান থেকে দেখা মেলে বহু কাঙ্ক্ষিত পূর্ব লঙ্কাছড়ার।
তবে যাত্রা সেখানেই শেষ নয়। আবারও কয়েক ঘণ্টার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে গেলে পাহাড়জুড়ে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু থেমে থাকে না সীমান্তরক্ষীদের টহল ও দায়িত্ব পালন।
এ অঞ্চলের বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। খাবার পানির জন্য প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার পাঁচশ ফুট নিচে নামতে হয়। অসুস্থতা, দুর্ঘটনা কিংবা স্বজন হারানোর খবর এলেও অনেক সময় দ্রুত নিচে নামা সম্ভব হয় না। যোগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল—কখনো নেটওয়ার্ক থাকে, কখনো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে পুরো এলাকা।
রেশন সামগ্রী বহন, জ্বালানি সংগ্রহ কিংবা বিওপি রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুতেই রয়েছে সীমাহীন কষ্ট। তবুও দায়িত্ব পালনে অবিচল সীমান্তের প্রহরীরা। তাদের একটাই প্রত্যয়—“দেশের এক ইঞ্চি মাটিও ছাড় দেওয়া হবে না।”
দুর্গম পাহাড়ের নিস্তব্ধ অন্ধকারেও সতর্ক চোখে জেগে থাকেন তারা। শুধু সীমান্ত পাহারা নয়, মানবিক দায়িত্ব পালনেও অনন্য ভূমিকা রাখছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।
সীমান্ত সুরক্ষা ও চোরাচালান দমনের পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন বিজিবি সদস্যরা। দীঘিনালা উপজেলা থেকে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের আড়ান্দিছড়া, টেক্কাছড়া ও শীলছড়া এলাকার মানুষের জন্য শিক্ষা ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছেন তারা।
স্কুল নির্মাণ, চেয়ার-টেবিল ও বেঞ্চ প্রদান, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার মতো নানা মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ।
পথহীন পাহাড়ের আঁধারে তাই বিজিবি শুধু সীমান্তের প্রহরী নয়, তারা দুর্গম জনপদের মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা ও মানবতার আরেক নাম।