মোজাদ্দেদীয়া তরিকা: শরিয়ত ও তরিকতের এক অপূর্ব সমন্বয় এবং সমাজ সংস্কারের কালজয়ী দর্শন
মো: ফিরোজ আল আমিন মোজাদেদ্দী
লেখক,সাংবাদিক
ইসলামের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে মোজাদ্দেদীয়া তরিকা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। এটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক সাধনার পথ নয়, বরং এটি ছিল একটি যুগান্তকারী সংস্কার আন্দোলন, যা ভারতীয় উপমহাদেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আকিদা ও আমল রক্ষায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। এই তরিকার প্রবর্তক হলেন দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বা মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী হযরত শেখ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)।তিনি নকশবন্দিয়া তরিকার মূল ধারার সাথে শরিয়তের কঠোর অনুশাসন যুক্ত করে এক নতুন আধ্যাত্মিক বিপ্লব সূচনা করেন, যা আজ মোজাদ্দেদীয়া তরিকা নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী (রহ.) ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম এক চরম সংকটের মুখোমুখি হয়। সম্রাট আকবর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘দীন-ই-ইলাহী’ নামক এক কৃত্রিম ও ভ্রান্ত ধর্মীয় মতবাদ প্রবর্তন করেন, যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও আকিদাকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছিল। সে সময় সুফিবাদের নামেও অনেক অনৈসলামিক প্রথা ও বেদাত সমাজে জেঁকে বসেছিল। এমন এক অন্ধকার সময়ে হযরত শেখ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)-এর আবির্ভাব ঘটে। তিনি নির্ভীকভাবে সম্রাটের ভ্রান্ত নীতির বিরোধিতা করেন এবং সুফিবাদের বিশুদ্ধতা পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। তাঁর এই আপসহীন সংগ্রামের কারণেই তাঁকে ‘মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী‘ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।মোজাদ্দেদীয়া তরিকার মূল দর্শন: শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বয় মোজাদ্দেদীয়া তরিকার সবচেয়ে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শরিয়ত ও তরিকতের মধ্যে পূর্ণ সমন্বয় সাধন। অনেক সুফি তরিকা যখন কেবল আধ্যাত্মিকতার ওপর জোর দিয়ে শরিয়তের বাহ্যিক বিধানকে গৌণ মনে করত, তখন মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী (রহ.) ঘোষণা করেন যে, শরিয়তের বিধান বাদ দিয়ে আধ্যাত্মিকতা কেবল পথভ্রষ্টতা। তাঁর মতে, “শরিয়ত হলো মূল গাছ, আর তরিকত হলো তার ফল।” এই তরিকা শিক্ষা দেয় যে, একজন প্রকৃত সুফিকে অবশ্যই সুন্নতে নববীর চুলচেরা অনুসরণ করতে হবে। মোজাদ্দেদীয়া তরিকায় শরিয়তের পরিপন্থী কোনো আমল বা আকিদার স্থান নেই।ওয়াহদাতুশ শুহুদ বনাম ওয়াহদাতুল ওজুদ সুফি দর্শনে মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী (রহ.)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো ওয়াহদাতুশ শুহুদ (সাক্ষ্যগত একত্ববাদ) দর্শনের প্রবর্তন। এর আগে ইবনে আরাবী (রহ.)-এর ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ (অস্তিত্বগত একত্ববাদ) দর্শন ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, যা অনেক ক্ষেত্রে স্রষ্টা ও সৃষ্টির পার্থক্যকে অস্পষ্ট করে তুলত এবং হিন্দু দর্শনের ‘অদ্বৈতবাদ’-এর সাথে মিশে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করত। মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী (রহ.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেন যে, স্রষ্টা ও সৃষ্টি কখনোই এক নয়। সৃষ্টি কেবল স্রষ্টার মহিমার প্রতিফলন বা সাক্ষ্য বহন করে মাত্র। তাঁর এই দর্শন মুসলিম উম্মাহর আকিদাকে শিরক ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছে।আধ্যাত্মিক সাধনার পদ্ধতি: জিকিরে খফি ও লতিফা মোজাদ্দেদীয়া তরিকার সাধনা পদ্ধতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং বিজ্ঞানসম্মত। এই তরিকা উচ্চস্বরে জিকিরের পরিবর্তে জিকিরে খফি বা নিরব জিকিরের ওপর গুরুত্বারোপ করে। সাধনার শুরুতে মানুষের দেহের পাঁচটি সূক্ষ্ম কেন্দ্র বা লতিফা (কালব, রুহ, সির, খফি, আখফা) জাগ্রত করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করা হয়। এরপর ‘নফস’ বা কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে ‘মাকামে এহসান’ বা আল্লাহর সার্বক্ষণিক উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত করা হয়। এই তরিকার মোরাকাবা বা ধ্যান পদ্ধতি একজন মুমিনকে দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত করে পরম সত্তার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে। সমাজ সংস্কার ও মুসলিম জাগরণে প্রভাব মোজাদ্দেদীয়া তরিকা কেবল খানকাহর ভেতরে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল একটি শক্তিশালী সমাজ সংস্কারক শক্তি। মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী (রহ.) তৎকালীন মোগল দরবারের প্রভাবশালী উজির-নাজিরদের কাছে পত্র লিখে (যা মাকতুবাত-ই-ইমাম রব্বানী নামে পরিচিত) তাঁদের মধ্যে ইসলামি চেতনা জাগ্রত করেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলেই পরবর্তী মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং বিশেষ করে সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীরের আমলে উপমহাদেশে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটে। মোজাদ্দেদীয়া তরিকার অনুসারীগণ সমাজ থেকে কুসংস্কার, বেদাত এবং অনৈসলামিক সংস্কৃতি দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এই তরিকার শিক্ষা মানুষকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক এবং আদর্শ মুমিন হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশে মোজাদ্দেদীয়া তরিকা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতিটি প্রান্তে মোজাদ্দেদীয়া তরিকার প্রভাব অত্যন্ত গভীর। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.), সাইয়্যিদ আহমদ বেরলভী (রহ.)-এর মতো মহান সংস্কারকগণ এই তরিকারই অনুসারী ছিলেন। বাংলাদেশেও এই তরিকার ব্যাপক প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। ফুরফুরা শরীফের পীর আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.), ছারছীনা শরীফ, আসাম বাংলার আকাবরে আউলিয়া খাজা ইউনুস আলী (রহ.) বিশ্ব শান্তি মুনন্জিল এনায়েতপুর দরবার শরীফ, মওলানা শাহ সুফি মোকিম উদ্দিন (রহ.) বিশ্ব ইসলাম প্রচার দপ্তর প্যারাডাইস পাড়া টাঙ্গাইল দরবার শরীফ, ওরেছ ইসলামপুরী (রহ.) ইসলামপুর দরবার শরীফ, মওলানা সৈয়দ লুৎফর রহমান (রহ.) দরবার এ রেসালাতে মোজাদ্দেদিয়া চরনরিনা শাহজাদপুর দরবার শরীফসহ দেশের অনেক প্রভাবশালী দরবার ও ওলামায়ে কেরাম এই সিলসিলার সাথে যুক্ত। বাংলার মানুষের ধর্মীয় ও নৈতিক চরিত্র গঠনে মোজাদ্দেদীয়া তরিকার পীর-মাশায়েখদের অবদান অপরিসীম। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও খানকাহগুলো আজও দ্বীনের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।বর্তমান বিশ্বে প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান আধুনিক বস্তুবাদী বিশ্বে মোজাদ্দেদীয়া তরিকার শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মানুষ যখন বাহ্যিক চাকচিক্য ও যান্ত্রিক ইবাদতের মধ্যে শান্তি খুঁজছে, তখন এই তরিকা অন্তরের গভীর প্রশান্তি ও আধ্যাত্মিকতার পথ দেখায়। এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মাঝেও আল্লাহর স্মরণে মগ্ন থাকা যায়। মোজাদ্দেদীয়া তরিকার উদার অথচ শরিয়তনিষ্ঠ দর্শন উগ্রবাদ ও নৈতিক অবক্ষয় রোধে একটি শক্তিশালী প্রাচীর হিসেবে কাজ করতে পারে।উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, মোজাদ্দেদীয়া তরিকা কেবল একটি সুফি সিলসিলা নয়, এটি ইসলামের মূল ধারার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি মানুষকে স্রষ্টার ভালোবাসায় সিক্ত করার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। মোজাদ্দেদ-ই-আলফে সানী (রহ.)-এর এই কালজয়ী দর্শন ও সাধনা পদ্ধতি আজও পথহারা মানুষকে সত্যের দিশা দিচ্ছে। পত্রিকার পাতায় এই মহান তরিকার ইতিহাস ও গুরুত্ব তুলে ধরা সময়ের দাবি, যাতে বর্তমান প্রজন্ম ইসলামের এই আধ্যাত্মিক ও সংস্কারবাদী রূপটি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে।




