টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিনিধি:
সাধারণত গ্রীষ্মকালে তরমুজের ভরা মৌসুম হলেও কক্সবাজারের টেকনাফে অসময়েই বাজারে উঠেছে লাল ও হলুদ রঙের তরমুজ। আগাম উৎপাদিত এসব তরমুজ ঘিরে ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে কৌতূহল। অন্যদিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাজারছড়া এলাকায় লবণাক্ত জমিতে মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে লাভের স্বপ্ন দেখছেন চার বন্ধু। তাঁদের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
টেকনাফের বাসস্টেশন বাজার, শাপলা চত্বর জিরো পয়েন্ট, অলিয়াবাদ স্কুলমাঠ, থানা মোড়, ওপরের বাজার, লামার বাজার ও উপজেলা পরিষদ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্রি হচ্ছে লাল ও হলুদ তরমুজ। মাঝারি আকারের লম্বাটে এসব তরমুজের বাইরের অংশ হালকা সবুজের ওপর গাঢ় সবুজ ডোরাকাটা। ভেতরে কোনোটি টকটকে লাল, আবার কোনোটি উজ্জ্বল হলুদ।
অসময়ে বাজারে আসা তরমুজ দেখতে ও কিনতে ফলের দোকানগুলোতে ভিড় করছেন ক্রেতারা। বিশেষ করে হলুদ তরমুজ দেখে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন। বিক্রেতারা জানান, আকারভেদে প্রতি কেজি তরমুজ ৮০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের একটি তরমুজ কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। লাল ও হলুদ দুই জাতের তরমুজই মিষ্টি ও সুস্বাদু বলে দাবি তাঁদের।
বাসস্টেশন এলাকার ফল বিক্রেতা নূর মোহাম্মদ বাদশা ও শামসুদ্দিন বলেন, অসময়ে তরমুজ বাজারে আসায় দাম কিছুটা বেশি। সামনে দাম কমলে বিক্রি বাড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন।
লবণাক্ত জমিতে মাচায় তরমুজ চাষ
টেকনাফে তরমুজের বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি উৎপাদনেও দেখা যাচ্ছে নতুন সম্ভাবনা। উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাজারছড়া এলাকার হলিউড পাহাড়সংলগ্ন লবণাক্ত জমিতে মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ শুরু করেছেন চার বন্ধু। তাঁরা হলেন শাদাত কবির, আব্দুর রহমান, মহিউদ্দিন ও মোস্তাক মৃধা।
তাঁদের মধ্যে তিনজন স্থানীয় রাজারছড়া এলাকার বাসিন্দা। অন্যজন মোস্তাক মৃধার বাড়ি ময়মনসিংহে। স্থানীয় তিন বন্ধু আগে পৃথকভাবে মাছের ব্যবসা করতেন। তবে ব্যবসায় আশানুরূপ লাভ না হওয়ায় বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছিলেন তাঁরা। পরে গরমের মৌসুম ও রমজানকে সামনে রেখে তরমুজ চাষের পরিকল্পনা করেন।
চাষের উপযোগী জমি খুঁজতে গিয়ে তাঁরা নানা সমস্যার মুখে পড়েন। এলাকার অনেক জমিতে লবণ চাষ হওয়ায় সেখানে ফসল উৎপাদন নিয়ে সংশয় ছিল। পরে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ১৪ কানি লবণাক্ত জমি বর্গা নিয়ে শুরু করেন তরমুজসহ বিভিন্ন ফলের চাষ। স্থানীয় হিসাবে এক কানি জমি ৪০ শতক।
মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাহাড় ও সমুদ্রঘেরা মনোরম পরিবেশে গড়ে তোলা বাগানে তরমুজ, মেলন, পেঁপে ও ট্যাং ফলের আবাদ করা হয়েছে। মোট জমির প্রায় ৬০ শতাংশে তরমুজ, ২০ শতাংশে মেলন এবং বাকি ২০ শতাংশে পেঁপে ও অন্যান্য ফল চাষ করা হয়েছে। ট্যাং ফল প্যাশন ফ্রুট নামেও পরিচিত।
১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ, লাভের আশা ৬ লাখ
চার বন্ধু জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সহযোগিতায় মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ শুরু করেন তাঁরা। প্রকল্পে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ইতিমধ্যে খেত থেকে প্রায় এক লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে খেতে আরও চার থেকে পাঁচ লাখ টাকার তরমুজ রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প থেকে অন্তত ছয় লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তাঁরা।
খেতের পরিচর্যার জন্য মাসিক বেতনে আটজন শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের দাবি, তরমুজের পাশাপাশি মেলন, পেঁপে ও ট্যাং ফলেরও ভালো ফলন হয়েছে।
তরমুজ চাষি মোস্তাক মৃধা বলেন, “কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সার্বিক সহযোগিতায় আমরা চার বন্ধু মিলে লবণাক্ত জমিতে মাচায় তরমুজ চাষ শুরু করি। শুরুতে কিছুটা সংশয় থাকলেও এখন ভালো ফলন পাচ্ছি। ইতিমধ্যে তরমুজ বিক্রি শুরু হয়েছে। আশা করছি, এ উদ্যোগ থেকে আমরা লাভবান হব। আমাদের সাফল্য দেখে অন্য চাষিরাও তরমুজ চাষে আগ্রহী হবেন।”
তরমুজ চাষ সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস তরমুজ চাষের উপযোগী সময়। তবে টেকনাফের আবহাওয়া ও স্থানীয় চাষাবাদের ধরন অনুযায়ী জুন-জুলাই মাসে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করা হয়, যা আগস্ট-সেপ্টেম্বরে উত্তোলন করা হয়। আবার অক্টোবর-নভেম্বর মাসে শীতকালীন তরমুজের বীজ বপন করা হয়। এসব তরমুজ ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া যায়।
গত বছর টেকনাফ উপজেলায় ১১৩ একর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছিল। চলতি মৌসুমে চাষের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। উপজেলার সেন্ট মার্টিন, সাবরাং, বাহারছড়া, টেকনাফ সদর, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং এলাকায় তরমুজের চাষ বেশি হচ্ছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিউল আলম কুতুবী বলেন, “শুধু তরমুজ নয়, টেকনাফে বিভিন্ন জাতের আগাম ফলও পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদা বেশি থাকায় তরমুজের চাষ বাড়ছে। হলুদ রঙের তরমুজও বাজারে এসেছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তরমুজের চাষ হচ্ছে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, “মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন নতুন ফলের আবাদ সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”
কৃষি বিভাগের সহযোগিতা, আগাম ফলের বাজার চাহিদা এবং উদ্যোক্তাদের নতুন উদ্যোগে টেকনাফে তরমুজসহ বিভিন্ন ফলের চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে। লবণাক্ত জমিতে মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের এই উদ্যোগ সফল হলে অনাবাদি ও লবণাক্ত জমিকে কৃষি উৎপাদনের আওতায় আনার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের বিকল্প আয়ের পথ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।