মো. মিশিকুল মন্ডল
স্টাফ রিপোর্টার
জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল সদরের একটি ডেন্টাল চেম্বারকে ঘিরে রোগী দেখা, প্রেসক্রিপশন লেখা এবং রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট (RCT) করানোর অভিযোগ উঠেছে। “কাইয়ুম ডেন্টাল কেয়ার” নামের ওই প্রতিষ্ঠানে এসব কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
প্রতিবেদকের হাতে আসা কয়েকটি প্রেসক্রিপশন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনা করে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগগুলোর আইনগত সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রয়োজন।
চেম্বার পরিচালনায় কারা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেম্বারটি পরিচালনা করেন মো. ছামছুদ্দীন ও তার ছেলে মো. আবু বক্কর সিদ্দিক।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মো. ছামছুদ্দীনের নামে কোনো স্বীকৃত ডেন্টাল চিকিৎসা ডিগ্রি বা সনদের তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, ২০০৫ সালে এক বছর মেয়াদি একটি প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর থেকে তিনি ডেন্টাল সেবা দিয়ে আসছেন। তার ব্যবহৃত প্রেসক্রিপশন প্যাডে নিজেকে বাংলাদেশ ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (BDA)-এর সদস্য হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রাপ্ত সনদ অনুযায়ী মো. আবু বক্কর সিদ্দিক স্টেট মেডিকেল ফ্যাকাল্টি থেকে ডেন্টাল মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (DMT) প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার নিবন্ধন নম্বর ৪০৯০৬ বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রেসক্রিপশনে RCT ও ওষুধের উল্লেখ
প্রতিবেদকের হাতে আসা তিনটি প্রেসক্রিপশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৫ জুলাই ২০২৬ তারিখের একটি প্রেসক্রিপশনে মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের নামের পাশে “RCT–১৫০০ টাকা” লেখা রয়েছে। একই প্রেসক্রিপশনে T-Ceef, Etorix ও Pantobex ওষুধের নামও উল্লেখ রয়েছে।
১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখের আরেকটি প্রেসক্রিপশনে তার নামেই Demoxil 500 mg এবং E-Torix 120 mg ওষুধের উল্লেখ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, ৬ জুন ২০২৫ তারিখের একটি প্রেসক্রিপশনে মো. ছামছুদ্দীনের নামের পাশে “RCT/Extraction” উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রেসক্রিপশনে Tofen, T-Ceef এবং Pronex MPS ওষুধের নামও রয়েছে।
এসব নথির ভিত্তিতে প্রশ্ন উঠেছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রোগী পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন প্রদান কিংবা RCT ও দাঁত তোলার মতো চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেছেন কি না।
টেকনোলজিস্টের কাজ নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশে ডেন্টাল চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট পেশার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত ডেন্টাল সার্জন এবং ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের দায়িত্ব ও কাজের পরিধি আলাদা। ডেন্টাল টেকনোলজিস্টের কাজ সাধারণত ডেন্টাল সার্জনকে কারিগরি সহায়তা দেওয়া এবং দাঁতের ছাপ, ক্রাউন, ব্রিজ, ডেঞ্চার ও অন্যান্য ডেন্টাল ডিভাইস তৈরির মতো কারিগরি কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
অন্যদিকে রোগী পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন প্রদান ও বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতি পরিচালনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পেশাগত নিবন্ধন ও আইনগত অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে কাইয়ুম ডেন্টাল কেয়ারে এসব সেবা কে, কী যোগ্যতায় এবং কোন অনুমোদনের ভিত্তিতে দিচ্ছেন—তা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
অনুসন্ধানের সময় মো. ছামছুদ্দীন তার প্রশিক্ষণ গ্রহণের বিষয়টি প্রতিবেদককে জানান। এ বিষয়ে প্রতিবেদকের কাছে ভিডিও সাক্ষাৎকার, প্রেসক্রিপশন ও অন্যান্য নথিপত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “আইনগত অনুমোদনের বাইরে ডেন্টাল চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হলে রোগীদের সংক্রমণ, চিকিৎসাজনিত জটিলতা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষে যাচাই করা প্রয়োজন।”
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, কম খরচে চিকিৎসার কথা বলে রোগীদের আকৃষ্ট করা হয়। তবে চিকিৎসা নেওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের জটিলতার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জয়পুরহাট জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিভিল সার্জন ডা. আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “লিখিত অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে ডেন্টাল চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন ও আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না—তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।