ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
একসময় সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সিনেমা হল। ঈদ, পূজা কিংবা সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া ছিল এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিকাশ এবং দর্শক সংকটের কারণে রায়গঞ্জ উপজেলার একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে উপজেলা তো বটেই, পুরো জেলাতেই চালু নেই কোনো সিনেমা হল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রায়গঞ্জ উপজেলার চান্দাইকোনা, ধানগড়া, নিমগাছী, সলঙ্গা ও ভূঁইয়াগাতী এলাকায় একসময় মোট ছয়টি সিনেমা হল ছিল। এসব হলে বাংলা চলচ্চিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হতো। আশপাশের গ্রামাঞ্চল থেকেও দর্শকরা দলে দলে সিনেমা দেখতে আসতেন। কিন্তু গত দুই দশকে দর্শক সংখ্যা কমে যাওয়া, স্যাটেলাইট টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক বিস্তারের কারণে এসব সিনেমা হল একে একে বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, আশির ও নব্বইয়ের দশকে সিনেমা হলগুলো ছিল এলাকার মানুষের প্রধান বিনোদন কেন্দ্র। নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পেলে টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যেত। বিশেষ করে ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রগুলো ঘিরে থাকত উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু আধুনিক বিনোদন মাধ্যমের প্রসার এবং হলগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে দর্শকরা ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন।
রায়গঞ্জের একটি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সাজেদুল আলম বলেন, “সময় ও রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জেলাজুড়ে থাকা সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন উপজেলা পর্যায়ে তো নয়ই, জেলা শহরেও কোনো সিনেমা হল চালু নেই। কোথাও কোথাও মাঝে মাঝে ভালো মানের সিনেমা প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। বর্তমান বাস্তবতায় বড় বড় মার্কেটে আধুনিক সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, উন্নত সাউন্ড সিস্টেম, আরামদায়ক আসন ব্যবস্থা এবং পরিবারবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে নতুন প্রজন্মকে আবারও প্রেক্ষাগৃহমুখী করা সম্ভব হবে।
রায়গঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সহসভাপতি শংকর কুমার দাস বলেন, “সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলার বিনোদনের একটি বড় ক্ষেত্র হারিয়ে গেছে। ভালো গল্পনির্ভর মানসম্মত সিনেমা নির্মাণই আবার দর্শকদের হলমুখী করতে পারে। এজন্য চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।”
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মতে, সিনেমা হলগুলো শুধু বিনোদনের মাধ্যমই ছিল না, বরং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। এসব প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে।
স্থানীয়রা জানান, চান্দাইকোনা, ধানগড়া, নিমগাছী, সলঙ্গা ও ভূঁইয়াগাতীর নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, একসময় এই এলাকার সিনেমা হলগুলো ছিল মানুষের অবসর, আনন্দ ও পারিবারিক বিনোদনের সবচেয়ে বড় ঠিকানা। বর্তমানে সেসব প্রেক্ষাগৃহের অনেকগুলো ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে, আবার কিছু জায়গায় গড়ে উঠেছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য স্থাপনা।
একসময় মানুষের স্বপ্ন, বিনোদন ও আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকা রায়গঞ্জের সিনেমা হলগুলো আজ শুধুই স্মৃতির অংশ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আধুনিক সিনেপ্লেক্স এবং মানসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে আবারও এই অঞ্চলে প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটবে।