হৃদয় রায়হান, কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
কুষ্টিয়ায় কর অঞ্চল কার্যালয়ের অফিস সহায়ক পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় প্রকৃত চাকরিপ্রার্থীর পরিবর্তে প্রক্সি পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিতে গিয়ে চারজনকে আটক করা হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডের সদস্যদের সতর্কতা ও কাগজপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে তাদের কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ প্রক্সি চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (২৪ জুন) বিকেলে কুষ্টিয়া কর অঞ্চল কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালে কয়েকজন পরীক্ষার্থীর আচরণ, পরিচয় ও তথ্য উপস্থাপনায় অসঙ্গতি লক্ষ্য করেন নিয়োগ বোর্ডের সদস্যরা। এতে তাদের সন্দেহ হলে সংশ্লিষ্ট চারজনকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় তারা নিজেদের পরিচয় সম্পর্কে অসংলগ্ন তথ্য দিতে থাকেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে নিয়োগ বোর্ড তাদের প্রবেশপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে। একপর্যায়ে দেখা যায়, প্রবেশপত্রে থাকা ছবির সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের চেহারার মিল নেই। আরও যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত চাকরিপ্রার্থীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিরা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন।
পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আটক চারজনই স্বীকার করেন যে, তারা প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে প্রক্সি হিসেবে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে এসেছিলেন। তাদের স্বীকারোক্তির পর নিয়োগ বোর্ড বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানায় এবং রাতেই চারজনকে কুষ্টিয়া মডেল থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতি চক্রের কাজ। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব চক্র সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে মেধাবী বা প্রশিক্ষিত অন্য ব্যক্তিকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিয়ে থাকে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে চক্রের মূল হোতা, দালাল এবং প্রকৃত চাকরিপ্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন মাতুব্বর বলেন, “নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। তদন্তে যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাগুলোতে জালিয়াতি রোধে পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়টি আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর করা হয়েছে। লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষাতেই প্রবেশপত্র, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি এবং অন্যান্য তথ্য একাধিক ধাপে যাচাই করা হচ্ছে। ফলে প্রক্সি পরীক্ষার্থী শনাক্ত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রক্সি পরীক্ষার্থী ব্যবহার শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধই নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও বড় ধরনের আঘাত। এ ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রক্সি চক্র সক্রিয় থাকার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। এসব চক্র ভুয়া পরিচয়পত্র, ছবি পরিবর্তন, জাল কাগজপত্র এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রতারণার চেষ্টা করে। তবে কঠোর নজরদারি ও আধুনিক যাচাই ব্যবস্থার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তারা ধরা পড়ছে।
এদিকে কুষ্টিয়ার এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সচেতন নাগরিকরা মনে করছেন, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও জালিয়াতি প্রতিরোধে প্রশাসনের এমন কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকলে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রকৃত চাকরিপ্রার্থী, দালাল এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে এ ঘটনায় আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।