ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিবেদক, সিরাজগঞ্জ:
সিরাজগঞ্জের বহুল আলোচিত চিকিৎসক ডা. বাকি মির্জা হত্যা মামলার দীর্ঘ ১৫ বছর পর রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। আলোচিত এ মামলায় দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ঘোষিত এ রায়ে মামলার বাদী, স্বজন এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে সিরাজগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-১ আদালতের বিচারক লায়লা শারমিন এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আনোয়ার হোসেন কিরণ আদালতে উপস্থিত ছিলেন। অপর দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জাকারিয়া মাসুদ পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই রায় ঘোষণা করা হয়।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বহুলী ইউনিয়নের খাগা গ্রামের আনোয়ার হোসেন কিরণ (৪৫) এবং সিরাজগঞ্জ পৌর এলাকার জানপুর মহল্লার জাকারিয়া মাসুদ (৪৩)।
আদালতের অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (এপিপি) শামসুজ্জোহা শাহান শাহ সাংবাদিকদের জানান, মামলার চার আসামির মধ্যে রুহুল আমীন বাবু বিচার চলাকালে মারা যাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অপর আসামি ডা. আব্দুল লতিফ উচ্চ আদালতে রিভিশন আবেদন করায় তার বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। উচ্চ আদালতে রিভিশন নিষ্পত্তির পর তার বিরুদ্ধে বিচার পুনরায় শুরু হবে।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ১৬ এপ্রিল রাতে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. বাকি মির্জা সিরাজগঞ্জ কালেক্টরেট চত্বরে অবস্থিত সরকারি ব্যাচেলর কোয়ার্টারের নিজ কক্ষে অবস্থান করছিলেন। গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা তার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে হাত-পা বেঁধে নৃশংসভাবে হত্যা করে। পরদিন সকালে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার হলে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। চিকিৎসক সমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
ঘটনার পর নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে চারজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ব্যক্তিগত সম্পর্কজনিত বিরোধের বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্ত চলাকালে সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহের ভিত্তিতেই চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে বিচারাধীন ছিল। এ সময় একাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা, নথিপত্র উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন। অবশেষে বুধবার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন।
আইনজীবীরা জানান, মামলার অন্যতম আসামি ডা. আব্দুল লতিফের দায়ের করা রিভিশন আবেদন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় তার বিরুদ্ধে বিচার আপাতত স্থগিত রয়েছে। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তের পর তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হবে।
এদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন কিরণ আদালতে উপস্থিত থাকলেও জাকারিয়া মাসুদ এখনও পলাতক রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
দীর্ঘ ১৫ বছর পর এ রায় ঘোষণার মাধ্যমে জেলার অন্যতম আলোচিত হত্যা মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তবে মামলার একটি অংশ এখনও বিচারাধীন থাকায় সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি এখন উচ্চ আদালতে চলমান রিভিশন আবেদনের নিষ্পত্তির দিকে। একই সঙ্গে পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।