নিজস্ব প্রতিবেদক | সিরাজগঞ্জ
উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সিরাজগঞ্জ–বগুড়া সরাসরি রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প আবারও আলোচনায় এসেছে। প্রায় আট বছর ধরে নানা জটিলতায় ধীরগতিতে চলা এই প্রকল্পে এবার এক লাফে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়ে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) জমা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই-বাছাই শেষে আগামী এক মাসের মধ্যে এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপিত হতে পারে। অনুমোদন মিললেই দরপত্র আহ্বানসহ নির্মাণকাজের পরবর্তী ধাপ শুরু হবে।
এক লাফে বাড়ল প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা
২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সংশোধিত ডিপিপিতে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪৪২ কোটি ৫৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা, যা প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার সমান।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকল্পে নতুন অবকাঠামো যুক্ত হওয়ায় এই ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
ভারতের অর্থায়ন বাতিলের পর স্থবিরতা
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটির বড় অংশের অর্থায়ন করার কথা ছিল ভারতের ঋণের মাধ্যমে। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত এই প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
বর্তমানে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) প্রকল্পটির অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সরকারের আশা, নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।
ভূমি অধিগ্রহণেই অতিরিক্ত ৩২৩ কোটি টাকা
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রায় ৯০২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। শুরুতে এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। কিন্তু নতুন মূল্যায়নে ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি ১৬ লাখ টাকায়।
অর্থাৎ শুধু জমি অধিগ্রহণেই অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৩২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ দুই জেলার প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং জমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
নতুন যুক্ত হচ্ছে ১৫ কিলোমিটার রেললাইন
সংশোধিত প্রকল্পে রানীরহাট জংশন থেকে গাবতলী পর্যন্ত নতুন ১৫ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ অংশে নতুন রেললাইন, বাইপাস, ওভারপাস, আন্ডারপাস, ভূমি অধিগ্রহণ এবং আধুনিক গাবতলী স্টেশন নির্মাণে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।
এই নতুন সংযোজনের ফলে বগুড়া শহরের যানজট কমবে এবং ভবিষ্যতে রেল চলাচল আরও সহজ ও নিরাপদ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রকল্পে যা যা থাকছে
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত প্রায় ৮৭ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মিত হবে। পাশাপাশি ৩৩ কিলোমিটার লুপ লাইন, করতোয়া নদীর ওপর ২৮৬ মিটার দীর্ঘ একটি সেতু, ইছামতী নদীর ওপর ২০৫ মিটার দীর্ঘ আরেকটি সেতু, ২২১টি ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট, ঢাকা–রংপুর মহাসড়কের ওপর একটি রেলওয়ে ওভারপাস এবং বগুড়া–নাটোর মহাসড়কে একটি রোড ওভারপাস নির্মাণ করা হবে।
এ ছাড়া সিরাজগঞ্জ ও রানীরহাটে দুটি জংশন, কৃষ্ণদিয়া, রায়গঞ্জ, চান্দাইকোনা, ছনকা, শেরপুর ও আড়িয়াবাজারে নতুন রেলস্টেশন নির্মাণ এবং বগুড়া, কাহালু ও সদানন্দপুর স্টেশনের আধুনিক পুনর্নির্মাণ করা হবে। রানীরহাট এলাকায় একটি ‘ওয়াই’ আকৃতির রেললাইন নির্মাণ করা হবে, যার একটি অংশ যাবে বগুড়ার দিকে এবং অন্য অংশ কাহালুর দিকে।
কমবে দূরত্ব, সাশ্রয় হবে সময়
বর্তমানে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের মধ্যে সরাসরি রেলপথ না থাকায় ট্রেনগুলোকে সান্তাহার, নাটোর ও ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
নতুন রেললাইন চালু হলে প্রায় ১১৪ কিলোমিটার পথ কমে যাবে। ফলে যাত্রীদের প্রায় তিন ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হবে। বর্তমানে যেখানে বগুড়া থেকে ট্রেনে ঢাকায় যেতে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে নতুন রেলপথ চালু হলে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীতে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মিঞা জানিয়েছেন, সংশোধিত ডিপিপি ইতোমধ্যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। একনেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান ও অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম শেষ করতে প্রায় নয় মাস সময় লাগবে। এরপর মূল নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।
তিনি বলেন, “২০১৮ সালের বাজারদরের ভিত্তিতে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে নির্মাণসামগ্রী, শ্রমিকের মজুরি এবং ডলারের বিনিময় হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয়ও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে।”
উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিরাজগঞ্জ–বগুড়া সরাসরি রেলসংযোগ চালু হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য ও যাত্রী পরিবহনে সময় এবং ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে বগুড়া, সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের জেলাগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার রেল যোগাযোগ আরও দ্রুত, সহজ ও আধুনিক হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।