ফিরোজ আল আমিন
নিজস্ব প্রতিনিধি:
মানুষের জীবনে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা অনেক সময় বড় একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখা দিলেও ইচ্ছাশক্তি, আত্মবিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে সেই সীমাবদ্ধতাকেও জয় করা সম্ভব। এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম সিরাজগঞ্জের তাড়াশ পৌরসভার ভাদাশ পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা রেজাউল করিম রেজা। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তার স্বাভাবিক চলাফেরাকে কঠিন করে তুললেও জীবনের কাছে তিনি কখনো হার মানেননি। কারও করুণা বা দানের ওপর নির্ভর না করে নিজের শ্রমে পরিবার চালানোর প্রত্যয় নিয়ে প্রতিদিন সংগ্রাম করে চলেছেন তিনি।
তিন সন্তানের জনক রেজাউল করিম রেজা বর্তমানে তাড়াশ পৌরসভার উত্তর বাঁধ এলাকায় একটি ছোট্ট চায়ের দোকান পরিচালনা করেন। প্রতিদিন ভোর থেকে দিনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয় তার। পুরোনো একটি হাতচালিত হুইলচেয়ারে করে বাড়ি থেকে দোকানে পৌঁছাতে তাকে বেশ কষ্ট করতে হয়। পথের উঁচুনিচু অংশ, ভাঙাচোরা রাস্তা কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। কষ্টকে সঙ্গী করেই প্রতিদিন দোকানে গিয়ে নিজ হাতে চা তৈরি, ক্রেতাদের আপ্যায়ন, দোকানের হিসাব-নিকাশ এবং অন্যান্য সব কাজ নিষ্ঠার সঙ্গে করে থাকেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রেজাউল করিম রেজা শুধু একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নন, তিনি আত্মমর্যাদা ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রতীক। আর্থিক সংকট, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা জীবনের নানা প্রতিকূলতা কখনো তাকে অন্যের দ্বারে সাহায্যের জন্য দাঁড় করাতে পারেনি। বরং নিজের পরিশ্রমকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তার এই মানসিক দৃঢ়তা ও কর্মস্পৃহা স্থানীয়দের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও অনুপ্রেরণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
দোকানে নিয়মিত আসা কয়েকজন ক্রেতা জানান, রেজাউল সবসময় হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলেন। ব্যক্তিগত কষ্ট বা অভাব-অনটনের কথা খুব একটা প্রকাশ করেন না। প্রতিটি কাপ চায়ের সঙ্গে তিনি যেন নিজের সততা, আন্তরিকতা ও পরিশ্রমও পরিবেশন করেন। এ কারণেই এলাকার মানুষের কাছে তিনি একজন সম্মানিত ও প্রিয় মানুষ।
রেজাউল করিম রেজা বলেন, “আমি কখনো চাইনি অন্যের দয়া বা করুণার ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে। আল্লাহ আমাকে যতটুকু শক্তি দিয়েছেন, তা দিয়েই নিজের পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে চাই। আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন, সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। তারা যেন ভবিষ্যতে আমার মতো কষ্টের জীবন না কাটায়।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে যে হাতচালিত হুইলচেয়ারটি ব্যবহার করছেন, সেটি অনেক পুরোনো এবং প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘ পথ হুইলচেয়ার চালিয়ে দোকানে যাওয়া-আসা করতে গিয়ে তাকে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাদাযুক্ত রাস্তা কিংবা গরমের দিনে দীর্ঘ সময় হুইলচেয়ার চালানো তার জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। অনেক সময় অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে ব্যবসায়ও প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রেজাউলের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার। এটি পেলে তার প্রতিদিনের যাতায়াত অনেক সহজ হবে, শারীরিক কষ্ট কমবে এবং ব্যবসায় আরও বেশি সময় দিতে পারবেন। ফলে পরিবারের আয়ও কিছুটা বাড়তে পারে।
এলাকার সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, সমাজে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা সামান্য সহযোগিতা পেলেই নিজেদের জীবনকে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিতে পারেন। রেজাউল করিম রেজা তাদেরই একজন। তার জন্য একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সমাজসেবী সংগঠনের জন্য খুব বড় বিষয় না হলেও এটি রেজাউলের জীবনকে অনেকটাই বদলে দিতে পারে।
এলাকাবাসী সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, মানবিক সংগঠন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রতি রেজাউলের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, একজন কর্মঠ ও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষকে সহযোগিতা করা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য দান-অনুদানের চেয়ে কর্মসংস্থান, চলাচলের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক প্রযুক্তি নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে তারা সমাজের মূলধারায় যুক্ত হয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন। রেজাউল করিম রেজার জীবনও সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের মনোবলই তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
রেজাউল করিম রেজার জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, আত্মবিশ্বাস, পরিশ্রম এবং আত্মসম্মানবোধ থাকলে মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই বদলে দিতে পারে। এখন প্রয়োজন সমাজের মানবিক মানুষের একটু সহযোগিতা, যাতে তিনি আরও সহজভাবে চলাচল করতে পারেন, ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পান এবং তিন সন্তানকে নিয়ে একটি নিরাপদ ও সম্মানজনক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। একটি ব্যাটারিচালিত হুইলচেয়ার হয়তো তার কাছে শুধু একটি যান নয়; বরং নতুন সম্ভাবনা, নতুন গতি এবং নতুন স্বপ্নের প্রতীক।