শিরোনাম
কমলনগরে আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরকে অশ্রুসজল বিদায় সিন্দুকছড়ি জোনের উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ বিতরণ পূর্বধলায় প্রবাসীর স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগ, অভিযুক্ত যুবক পলাতক সোনারগাঁয়ে ২ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারী মাদক কারবারি আটক ব্রিজ নির্মাণে উচ্চতা কম, বন্ধ হতে পারে চলনবিলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ তাড়াশে ‘নজরুল বর্ষ ২০২৬’ উদযাপনের উদ্বোধন তরুণ প্রজন্মের মাঝে নজরুলের সাম্য, মানবতা ও দেশপ্রেমের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নাসিরনগর – মাধবপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক চলাচলের অনুপযোগী ,জনভোগান্তি চরমে  সোনারগাঁওয়ে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সিরাজগঞ্জে হেলথ কেয়ার হসপিটালে সিজারের সময় প্রসূতির মৃত্যু, চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তাড়াশে লীলা কীর্তনে ৮০০ মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ, গণসংযোগে কাউন্সিলর প্রার্থী শুকুর মির্জা
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ন

ব্রিজ নির্মাণে উচ্চতা কম, বন্ধ হতে পারে চলনবিলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ

প্রতিবেদকের নাম / ২৪ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬

 

চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি:

দেশের অন্যতম বৃহৎ বিলাঞ্চল চলনবিল। বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এ বিলজুড়ে নদী-খাল ও জলপথের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। কৃষিপণ্য পরিবহন, মাছ ধরা, মানুষের যাতায়াত থেকে শুরু করে পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই এ অঞ্চলের নৌপথের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তবে পাবনার চাটমোহর উপজেলার কাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি ব্রিজের উচ্চতা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণাধীন ব্রিজটির উচ্চতা তুলনামূলক কম হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে খড়, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্যবোঝাই বড় নৌযান, ট্রলার ও পর্যটকবাহী নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে চলনবিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয়দের দাবি, ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং তারা উন্নয়নকাজের বিরোধিতা করছেন না। তবে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি নৌপথও সচল রাখতে ব্রিজটির উচ্চতা বাড়িয়ে নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

এদিকে ব্রিজটির নির্মাণকাজ স্থগিত রেখে নকশা পুনর্বিবেচনা এবং উচ্চতা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্ট আট কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল লতিফ। গত ১০ আগস্ট স্থানীয় সরকার সচিব, পানি সম্পদ সচিব, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান, পাবনার জেলা প্রশাসক ও চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ নোটিশ দেওয়া হয়।

৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণ

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বৃহত্তর পাবনা ও বগুড়া জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর আওতায় ছাইকোলা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হান্ডিয়াল ইউনিয়ন পরিষদ অফিস সড়কের মুনিয়াদিঘী কৃষি কলেজের কাছে কাটা নদীর ওপর ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

৮৮ দশমিক ১০ মিটার দীর্ঘ পিএসবি গার্ডার ব্রিজটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি। আইসিএল প্রাইভেট লিমিটেড ওসি (জেভি) নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রিজটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিজটির নিচ দিয়ে পর্যাপ্ত উচ্চতার নৌপথ রাখা হচ্ছে না। ফলে বর্ষায় পানির উচ্চতা বাড়লে ছইওয়ালা নৌকা, খড়বোঝাই নৌকা, বাল্কহেড, পণ্যবাহী ট্রলার ও পর্যটকবাহী বড় নৌযান চলাচল করতে সমস্যায় পড়তে পারে।

কৃষিপণ্য পরিবহনেও পড়তে পারে প্রভাব

চলনবিল অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নৌপথের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্ষায় বিলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে প্লাবিত হলে অনেক গ্রামের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে নৌকা। একই সঙ্গে কৃষকরা ধান, খড়সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য নৌপথে হাট-বাজারে নিয়ে যান।

স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ অঞ্চলের কৃষকরা মাঠের ধান ও গবাদিপশুর খাদ্য খড় নৌকায় করে বিভিন্ন হাট-বাজারে নিয়ে যান। বিশেষ করে খড়বোঝাই নৌকা তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় ব্রিজের উচ্চতা কম হলে এসব নৌকা চলাচল করতে পারবে না। তখন সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হবে, এতে কৃষকদের পরিবহন ব্যয় বাড়বে।

নৌকার মাঝি মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, বর্ষায় কাটা নদী দিয়ে নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর ও বড়াইগ্রাম, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়া এবং পাবনার চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুরসহ চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা হয়। নৌপথে চলাচলে সময় ও খরচ দুটোই কম। কিন্তু ব্রিজটি নিচু হলে পানির উচ্চতা বাড়ার পর বড় নৌকা চলাচল করতে পারবে না।

উন্নয়নের সঙ্গে নৌপথ সচলের দাবি

হান্ডিয়ালের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, তারা ব্রিজ নির্মাণের বিপক্ষে নন। বরং দীর্ঘদিন ধরেই এ এলাকায় একটি ব্রিজের প্রয়োজন ছিল। নদীর ওপারের ফসলি জমি থেকে উৎপাদিত পণ্য আনা-নেওয়া এবং আশপাশের গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে ব্রিজটি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বর্ষায় নৌকায় চলাচল করা গেলেও পানি নেমে গেলে কাদা-মাটির রাস্তা দিয়ে রোগী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ হয়। তাই সড়ক যোগাযোগের জন্য ব্রিজটি প্রয়োজন। কিন্তু ব্রিজ নির্মাণ করতে গিয়ে যদি নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে নতুন সংকট তৈরি হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, চলনবিলের গুমানী, আত্রাই ও বড়ালসহ বিভিন্ন নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজগুলোতে নৌযান চলাচলের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কাটা নদীর ব্রিজটিও একইভাবে নৌযান চলাচলের উপযোগী করে নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

পর্যটনেও পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব

চলনবিলের নৌপথ শুধু স্থানীয় যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যম নয়; বর্ষাকালে এটি পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছর বর্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকেরা বড় নৌকা ও ট্রলারে করে চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, কাটা নদীর ওপর নিচু ব্রিজ নির্মাণের কারণে বড় নৌযান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে কৃষিপণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আইনি নোটিশ, প্রয়োজনে রিটের হুঁশিয়ারি

নোটিশদাতা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আব্দুল লতিফ বলেন, এলাকার সন্তান হিসেবে নাগরিক দায়িত্ব থেকেই তিনি আইনি নোটিশ দিয়েছেন। তার মতে, ব্রিজটি এমনভাবে নির্মাণ করা উচিত, যাতে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌপথ যোগাযোগও বজায় থাকে।

তিনি জানান, দ্রুত নকশা সংশোধন করে ব্রিজের উচ্চতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া না হলে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইড ইঞ্জিনিয়ার হৃদয় হোসেন বলেন, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ীই ব্রিজের নির্মাণকাজ চলছে। নির্মাণের পর দুই বছর ব্রিজটি নজরদারির মধ্যে থাকবে। ভবিষ্যতে নৌযান চলাচলে সমস্যা হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্রিজের উচ্চতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রশাসনের পর্যালোচনার আশ্বাস

চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুসা নাসের চৌধুরী বলেন, এলজিইডির উচ্চপদস্থ একটি প্রতিনিধি দল ইতোমধ্যে সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। প্রয়োজন হলে পুনরায় সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কাটা নদীর এ অংশটি বিআইডব্লিউটিএর স্বীকৃত কোনো নৌ চ্যানেল নয়। এলজিইডির নির্ধারিত পরিমাপ ও নীতিমালা অনুসরণ করেই ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবির বিষয়টি তারা বিবেচনায় রেখেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তী সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়—চলনবিলের জলপথ, কৃষি, জীবিকা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। তাদের দাবি, ব্রিজ নির্মাণ হোক, তবে চলনবিলের নৌপথ সচল রেখেই।

ছবি: পাবনার চাটমোহরে কাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন ব্রিজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রিজটি নিচু উচ্চতায় নির্মাণ করা হলে বর্ষায় বড় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভস
31 August 2026

ব্রিজ নির্মাণে উচ্চতা কম, বন্ধ হতে পারে চলনবিলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ

www.dainikkagoj.com
31 August 2026

ব্রিজ নির্মাণে উচ্চতা কম, বন্ধ হতে পারে চলনবিলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ

www.dainikkagoj.com