যাদব চন্দ্র রায়:
বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। নানা সংকট ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এই ঐক্যই বাঙালি জাতিসত্তার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান সময়ে সামাজিক বাস্তবতা নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার মানুষের যোগাযোগ সহজ করলেও, এর অপব্যবহার কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির হাতিয়ার হয়ে উঠছে। যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও উস্কানিমূলক প্রচারণা মুহূর্তেই সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও পরমতসহিষ্ণুতার অভাব সমাজের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তবে আশার জায়গাও রয়েছে। বিভিন্ন দুর্যোগ ও সংকটে আমরা বারবার দেখেছি—মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার বন্ধনে একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়দিন কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব আজ কেবল নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা পরিণত হয়েছে সার্বজনীন সম্প্রীতির মিলনমেলায়। এই চর্চাই প্রমাণ করে, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা এখনো গভীরভাবে প্রোথিত।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সচেতনতা ও মানবিক শিক্ষা। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একযোগে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি না হয়।
রাষ্ট্রেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো অপশক্তি যাতে ধর্মকে ব্যবহার করে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য আইনের শাসন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিকল্প নেই। “সবার উপরে মানুষ সত্য”—এই মানবিক চেতনা ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি শান্তিপূর্ণ, উন্নত ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠনের প্রধান শক্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং অটুট সম্প্রীতি।