লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার মেঘনা নদীর মাতাব্বরহাট ও মতিরহাট লঞ্চঘাটের ইজারা নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA), জেলা পরিষদ এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের মধ্যে দায়িত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েনের পাশাপাশি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে ঘাট পরিচালনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে ভোলা-লক্ষ্মীপুরসহ আন্তঃবিভাগীয় নৌরুটের হাজারো যাত্রী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে লাইফ জ্যাকেট ও প্রয়োজনীয় ফিটনেসবিহীন ছোট নৌকায় প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন সাধারণ মানুষ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
জানা গেছে, কমলনগর উপজেলার চর কালকিনি গ্রামের বাসিন্দা মো. মুক্তার হোসেন দায়ের করা রিট পিটিশন (নং-৪৪৪২/২০২৬)-এর শুনানি শেষে হাইকোর্ট ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের যাত্রীপ্রতি টোল আদায়ের জন্য প্রকাশিত টেন্ডারের ৩ ও ৪ নম্বর ক্রমিক (মাতাব্বরহাট ও মতিরহাট ঘাট) ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। একই সঙ্গে টেন্ডারটি কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
এদিকে BIWTA-এর পরিবহন পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন জানান, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় আপাতত কাউকেই ঘাট ইজারা দেওয়া সম্ভব নয় এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষ তদারকি করছে।
তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে মোক্তার হোসেন ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দুই বছরের ইজারা গ্রহণ করেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ভ্যাট ও আয়করসহ প্রায় ১৪ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৫ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে চুক্তি সম্পন্ন করা হয়।
ইজারাদার মোক্তার হোসেনের অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি তাকে ঘাট পরিচালনা করতে দিচ্ছেন না। অন্যদিকে অভিযুক্তদের দাবি, BIWTA-এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তার নির্দেশেই তারা ঘাট পরিচালনা করছেন। আবার আরেক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি মূল ইজারাদারের কাছ থেকে উপ-ইজারা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইজারা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পর্যাপ্ত নৌযান, বৈধ রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সনদ, যাত্রী ওঠানামার জেটি, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও গণশৌচাগার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এসবের বেশিরভাগই নেই। যাত্রীদের কাদা-পানি মাড়িয়ে নৌকায় উঠতে হচ্ছে এবং ঘাটের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর।
এ বিষয়ে ইজারাদার মোক্তার হোসেন দাবি করেন, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের অনুমোদনেই সাব-ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে BIWTA-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পুনরায় নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মতিরহাট, মাতাব্বরহাট, মাঝেরচর, চর পদ্মা, মদনপুর, ভোলার নাসির মাঝির ঘাট ও তুলাতলি রুটে ছোট নৌকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল বহন করা হচ্ছে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
মাঝেরচর থেকে আসা কয়েকজন যাত্রী জানান, জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে তারা ঝুঁকি নিয়েই নদী পারাপার করছেন। নৌকাগুলোতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী, দুধের ক্যান ও ভারী মালামাল বহন করা হচ্ছে।
শাহজাহান মাঝি নামে এক নৌকাচালকও স্বীকার করেন, ছোট নৌকায় প্রতিদিন যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে, যা নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
স্থানীয়দের দাবি, আইনি জটিলতা দ্রুত নিরসন করে ঘাট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং নিরাপদ নৌযান চলাচল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।