শিরোনাম
খাগড়াছড়িতে করলিয়া প্রকল্পের উদ্যোগে বৃক্ষের চারা বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ রায়গঞ্জে সেতুর মুখ ভরাটের অভিযোগ: জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে ৫০০ বিঘা আবাদি জমি, ক্ষতির শঙ্কায় শতাধিক কৃষক সংকুচিত চলনবিল, বিস্তৃত সম্ভাবনা কৃষি ও মৎস্যসম্পদে খুলতে পারে দেশের সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার সিংড়ায় স্কুলছাত্রীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ, অভিযুক্ত আটক ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী পরিবারের মাঝে বৃক্ষের চারা বিতরণ, উদ্বোধন হলো বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি মাটিরাঙ্গায় টিএসএফের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও শিক্ষাবিষয়ক দিকনির্দেশনা সভা অনুষ্ঠিত কমলনগরে ৫ কোটি টাকার সেতুতে ধস, ঝুঁকিতে প্রতিদিনের ৩০ হাজার মানুষের যাতায়াত দর্শনা পৌরসভা নির্বাচনে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় মশিউর রহমান তাড়াশে ২ হাজার ৬০০ কৃষকের মাঝে কৃষি প্রণোদনা বিতরণ, রোপা আমন বীজ ও সার পেলেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা
রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:০২ অপরাহ্ন

সংকুচিত চলনবিল, বিস্তৃত সম্ভাবনা কৃষি ও মৎস্যসম্পদে খুলতে পারে দেশের সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার

প্রতিবেদকের নাম / ১১ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

ফিরোজ আল আমিন :

বাংলাদেশের বৃহত্তম জলাভূমিগুলোর অন্যতম ঐতিহ্যবাহী চলনবিল একসময় ছিল দেশের প্রধান শস্য ও মৎস্যভাণ্ডার। শত বছরের বিবর্তনে সেই চলনবিল আজ তার অনেক ঐতিহ্য, নাব্যতা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে উপনীত হয়েছে। তবে আশার বিষয় হলো, নানামুখী সংকটের মধ্যেও চলনবিলের কৃষি, মৎস্য ও বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা গেলে চলনবিল বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, একসময় সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ ও বগুড়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছিল চলনবিল। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে জনবসতি বাদে চলনবিলের জলময় অংশের আয়তন ছিল ৫০০ বর্গমাইলেরও বেশি। পরে বিভিন্ন সময়ে নদী-খালের নাব্যতা সংকট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ফলে চলনবিলের আয়তন ক্রমাগত কমতে থাকে।১৯০৯ সালের চলনবিল জরিপ কমিটির প্রতিবেদনে বিলের আয়তন ১৪২ বর্গমাইলে নেমে আসে। বর্তমানে প্রায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বিলাঞ্চল বর্ষাকালে পানিতে পূর্ণ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় বিশাল কৃষিজমিতে। পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও খাল-নদী দখলের কারণে চলনবিল তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে।বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্ণ ভূমিতে শুরু হয় কৃষিকাজ। পৌষ ও মাঘ মাসে বোরো ধানের চারা রোপণ করা হয় এবং বৈশাখ থেকে শুরু হয় ধান কাটা। বর্তমানে চলনবিল দেশের অন্যতম বৃহৎ বোরো উৎপাদনকারী অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

ধানের পাশাপাশি এ অঞ্চলে উৎপাদিত হচ্ছে সরিষা, পাট, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, আলু, গাজর, শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, লাউ, তরমুজ, বাঙ্গিসহ নানা ধরনের রবি ফসল ও শাকসবজি। উর্বর মাটি ও অনুকূল পরিবেশের কারণে এসব ফসলের উৎপাদন প্রতিবছর বাড়ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিলের উৎপাদিত কৃষিপণ্য শুধু স্থানীয় চাহিদাই পূরণ করছে না, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে। অমৃতকুণ্ডা, মির্জাপুর, ছাইকোলা ও মহিশলুটি হাটসহ চলনবিলের বিভিন্ন হাট থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সবজি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও এসব কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে।একসময় চলনবিল ছিল দেশীয় মাছের অন্যতম প্রধান উৎস। চলনবিলের মাছের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছিল। যদিও বর্তমানে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমেছে, তবে বাণিজ্যিক মৎস্যচাষ নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে চলনবিল অঞ্চলে ব্যাপকভাবে রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে কুচিয়া ও কাঁকড়া চাষও সম্প্রসারিত হয়েছে, যার একটি বড় অংশ বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলে বর্তমানে ৬ হাজার ২৭৫ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। প্রায় ১২ হাজার ২৮৪ দশমিক ৭৫ হেক্টর জলাভূমিতে বছরে প্রায় ৫ হাজার ২৩১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে।

চলনবিলের মানুষ এখন শুধু কৃষি ও মাছের ওপর নির্ভরশীল নন। এ অঞ্চলে গবাদিপশু পালন, হাঁস-মুরগি খামার, বাণিজ্যিক মৌচাষ, শামুক ও চিংড়ি চাষের মতো বিকল্প অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বিশেষ করে সরিষা ফুলকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যিক মৌচাষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উৎপাদিত মধু দেশের বাজারে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করেছে। এসব কার্যক্রম গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াচ্ছে।

অপরিসীম সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও চলনবিল অঞ্চল নানা সমস্যায় জর্জরিত। নদী ও খালের নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, সংরক্ষণাগারের অভাব, বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মৌসুমি বেকারত্ব এ অঞ্চলের প্রধান সমস্যা।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত হিমাগার ও সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না। অন্যদিকে বর্ষা শেষে বছরের কয়েক মাস অনেক মানুষ কর্মহীন অবস্থায় কাটাতে বাধ্য হন।পরিবেশবিদদের মতে, চলনবিলকে রক্ষা করতে হলে এর সঙ্গে সংযুক্ত নদী ও খালগুলোকে দখলমুক্ত করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্যায়ন ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সম্প্রসারণ করা গেলে চলনবিল থেকে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো গেলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চলনবিল শুধু একটি জলাভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক অমূল্য সম্পদ। পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে চলনবিল দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে।

প্রকৃতি ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে চলনবিলকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ভবিষ্যতে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় জনগণ।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
আর্কাইভস
05 July 2026

সংকুচিত চলনবিল, বিস্তৃত সম্ভাবনা কৃষি ও মৎস্যসম্পদে খুলতে পারে দেশের সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার

www.dainikkagoj.com
05 July 2026

সংকুচিত চলনবিল, বিস্তৃত সম্ভাবনা কৃষি ও মৎস্যসম্পদে খুলতে পারে দেশের সমৃদ্ধির নতুন দুয়ার

www.dainikkagoj.com