মোঃ হাসানুর জামান বাবু, চট্টগ্রাম
টানা অতি ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে আবারও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে বাসাবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক প্লাবিত হয়। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, যানবাহন চালক ও সাধারণ নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া অফিসে ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে এই ভারী বর্ষণ হয়েছে এবং আগামী দুই থেকে তিন দিন একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।
ভারী বর্ষণের কারণে আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, কাতালগঞ্জ, হালিশহর, কুয়াইশ, কাজিরহাট, আকমল আলী রোড, নিউমুরিং, সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোড, কাপাসগোলা, ফরিদার পাড়া, কাট্টলী, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর ও ঈশান মহাজন সড়কসহ নগরীর অসংখ্য এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
সকালে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী মানুষের ভোগান্তি ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেককে জুতা-স্যান্ডেল হাতে নিয়ে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। অনেক এলাকায় রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও গণপরিবহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
টানা বৃষ্টির কারণে নগরীর অসংখ্য বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ে। এতে আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ব্যবসায়িক মালামালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিচতলার বাসিন্দাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় সামগ্রী উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
আগ্রাবাদের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও অনেক স্থানে সড়কের ওপর জমে থাকা মাটি অপসারণ করা হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানির সঙ্গে সেই মাটি আবার ড্রেনে গিয়ে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করছে। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে উড়াল সেতুর র্যাম্প নির্মাণকাজ চলায় সড়কে কাদা ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে, যা জলাবদ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চকবাজারের পথচারী মাওলানা মহিউদ্দিন বলেন, “চট্টগ্রামে মাঝারি বৃষ্টি হলেও নগরের অধিকাংশ এলাকায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। চকবাজার, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট ও মুরাদপুরের অলিগলিতে দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটুসমান পানি জমে থাকে।”
ইপিজেড এলাকার নিউমুরিং রোড, আকমল আলী রোড ও বন্দর টিলা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়ক ডুবে শতাধিক দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, অতিবৃষ্টির পানির সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা ফরিদ বলেন, “প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সকালে অফিসে বের হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয়েছে।”
বাকলিয়ার গৃহিণী গোলশান বলেন, “বৃষ্টির পর বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হয়েছে। এত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হয়নি।”
আগ্রাবাদের ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, “দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়েছে। প্রতি বর্ষায় একই ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও অতি ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা, খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং চলমান উন্নয়নকাজের কারণে পানি দ্রুত নামতে পারছে না বলে মনে করছেন তারা।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, সোমবার সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি চলতি মৌসুমের অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের ঘটনা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে পানি নিষ্কাশনে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে বিভিন্ন খাল, নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীরা মাঠে থেকে পানি নিষ্কাশনের কাজ করছেন।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী দুই থেকে তিন দিন চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না; খাল পুনরুদ্ধার, সঠিক নগর পরিকল্পনা, কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং চলমান প্রকল্প দ্রুত ও মানসম্মতভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগে পড়তে হবে চট্টগ্রামবাসীকে।