রায়গঞ্জে গমের সোনালি বিপ্লব: এক ফসলেই ঘুচছে অভাব
মো. ফিরোজ আল আমিন,
নিজস্ব প্রতিনিধি:
মাঠের পর মাঠ সোনালি আভা। যতদূর চোখ যায়, উত্তুরে হাওয়ায় দুলছে পরিপুষ্ট গমের শীষ। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার কৃষকদের চোখে-মুখে এখন সেই সোনালি আভারই প্রতিফলন। এক সময় যেসব জমিতে ধান চাষ করে খরচের টাকা তুলতেই হিমশিম খেতে হতো, আজ সেই জমিতেই গমের বাম্পার ফলনে নতুন স্বপ্ন বুনছেন এই অঞ্চলের কৃষকেরা। রায়গঞ্জে গম চাষ এখন আর কেবল চাষাবাদ নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে ভাগ্যবদলের এক জীবন্ত হাতিয়ার।
খরচে সাশ্রয়, লাভে দ্বিগুণ
উপজেলার চান্দাইকোনা ইউনিয়নের কৃষক সোহাগ সরকারের উঠানে এখন গমের মৌ মৌ গন্ধ। তিনি শোনালেন তার বদলে যাওয়ার গল্প। সোহাগ বলেন, “ধান চাষে এখন সেচ, সার আর শ্রমিকের যে খরচ, তাতে লাভ থাকে না বললেই চলে। কিন্তু গম চাষে সেচ লাগে মাত্র দুই-তিনবার। রোগবালাইও নেই বললেই চলে। খরচ কম হওয়ায় এবার আমার সংসারে স্বচ্ছলতা এসেছে।”
শুধু সোহাগ নন, নলকা ইউনিয়নের কুমাজপুর গ্রামের শাহজাহান আলীর গল্পটাও একই রকম। ১ বিঘা জমিতে প্রায় ১০ মণ গম পেয়ে তিনি এখন স্বাবলম্বী। তার মতে, গম চাষে ঝুঁকি কম আর বাজারে চাহিদা অনেক বেশি, তাই লোকসানের কোনো ভয় নেই।
হাটে হাটে গমের রাজত্ব
উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চান্দাইকোনা ও সলঙ্গা হাট এখন গম ব্যবসায়ীদের পদচারণায় মুখর। সাতসকালে ভ্যান বোঝাই গমের বস্তা নিয়ে হাটে আসছেন কৃষকেরা। ভালো দাম পাওয়ায় হাটের পরিবেশটাও যেন উৎসবমুখর। পাইকারি ব্যবসায়ীরাও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গম কিনতে প্রতিযোগিতায় নামছেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমেছে, আর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হয়েছে সাধারণ কৃষকের।
কৃষি বিভাগের নীরব সমর্থন
রায়গঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ৮৫ হেক্টর জমিতে গমের আবাদ হয়েছে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং কৃষকদের সচেতনতা ও আধুনিকায়নের প্রতীক।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম জানান, “রায়গঞ্জের মাটি গম চাষের জন্য অত্যন্ত উর্বর। আমরা কৃষকদের শুধু বীজ দিয়ে নয়, বরং আধুনিক কলাকৌশল ও সঠিক পরিচর্যার পরামর্শ দিয়ে পাশে থাকছি। যার ফলে উৎপাদন খরচ কমিয়ে তারা এখন অনেক বেশি লাভবান হচ্ছেন।”
আগামীর স্বপ্ন
এক সময় এই অঞ্চলের অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। কিন্তু এখন উন্নত জাতের গমের আগমনে সেই চিত্র বদলে গেছে। সরকারি প্রণোদনা ও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার আরও বাড়লে রায়গঞ্জ হবে গমের অন্যতম প্রধান ভাণ্ডার—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
অভাবকে জয় করে রায়গঞ্জের কৃষকেরা আজ সোনালি স্বপ্নের পথে হাঁটছেন। গমের এই বাম্পার ফলন প্রমাণ করে দিচ্ছে—সঠিক পরিকল্পনা আর পরিশ্রম থাকলে মাটির বুক থেকেই ছিনিয়ে আনা সম্ভব সচ্ছলতার চাবিকাঠি।








