অরণ্যের সুর ২.০: লোকজ সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের উৎসব
সুব্রত কুমার পাল, বুটেক্স প্রতিনিধি:
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত হলো ‘অরণ্যের সুর ~ ফোক ফেস্ট ২.০’। লোকজ সুর, সংস্কৃতি ও প্রাচীন আবহের রঙে সেদিন যেন পুরো ক্যাম্পাস রূপ নিল এক বিশাল লোকসংস্কৃতির মেলায়। নগরের ব্যস্ত জীবনে বিলীন হতে থাকা আমাদের মাটির গন্ধ, হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আর বাঙালির লোকজ সুরকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার আন্তরিক প্রয়াসেই এই আয়োজন।
১৬ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ রূপ নেয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। সেখানে বসে পণ্য ও হস্তশিল্পের স্টল, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করেন। পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় বিভাগীয় কুইজ প্রতিযোগিতা, যা উৎসবকে দেয় বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্ছ্বাস। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে শুরু হয় সাংস্কৃতিক পর্ব—বাউল গান, পালাগানসহ লোকজ সুরের বৈচিত্র্যে দর্শক হৃদয় মুগ্ধ হয়ে ওঠে।
‘অরণ্যের সুর’-এর যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে—১২ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার রুমে পাঠচক্র ও সাহিত্য কথনের মধ্য দিয়ে। ১৩ অক্টোবর কদমতলায় আলোড়ন তোলে পথনাটক। ১৪ অক্টোবর আয়োজন করা হয় ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও থিয়েটার কর্মশালা ‘হাতে খড়ি’, আর ১৫ অক্টোবর ছিল শর্টফিল্ম প্রদর্শনী। প্রতিটি দিন, প্রতিটি পর্ব নিজস্ব সৌন্দর্যে উৎসবকে করেছে পরিপূর্ণ।
বুটেক্স সাহিত্য সংসদের সভাপতি সৌরভ চৌহান বলেন,
“অরণ্যের সুর শুধুই একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি আমাদের শেকড়ের সঙ্গে আন্তরিক পুনঃসংযোগের প্রচেষ্টা। আধুনিকতার স্রোতে ভেসে যেতে যেতে আমরা হারাচ্ছি আমাদের লোকজ সুর, প্রাচীন গল্প আর গ্রামীণ ঐতিহ্যের রেশ। ‘অরণ্যের সুর’-এর মাধ্যমে সেই বিস্মৃত সুরকে আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছি, তরুণদের মনে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছি লোকসংস্কৃতির সৌন্দর্য। আমরা বিশ্বাস করি, লোকজ সংস্কৃতি কোনো অতীতের স্মারক নয়—এটি আমাদের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তির যুগেও আমরা যেন না ভুলি আমাদের মাটির গন্ধ, এ চেতনাকে জীবন্ত রাখাই ছিল এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।”
বুটেক্স সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক অর্পণ সাহা বলেন,
“বুটেক্সে অসংখ্য সুন্দর আয়োজন দেখেছি, সবসময় মনে হতো—যদি কোনোদিন বড় কিছু করার সুযোগ পাই, মন-প্রাণ দিয়ে সেটিকে সফল করব। এইবার সেই সুযোগ পেয়েছি, আর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। তবে সত্যিকারের শক্তি ছিল আমাদের জুনিয়রদের নিরলস পরিশ্রম—ওদের সহযোগিতা ছাড়া এ আয়োজন সম্ভব হতো না, তাই তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা অসীম। আমরা কতটা ভালো করতে পেরেছি, তা দর্শক ও অংশগ্রহণকারীরা সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন। তবে যেটা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে, তা হলো—শেষ দিনের সেই মুহূর্ত, যখন সবাই মিলে একসাথে অনুষ্ঠান উপভোগ করেছি। সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আশা করি সামনে বুটেক্স সাহিত্য সংসদ আরও বৃহৎ, সৃজনশীল এবং প্রাণবন্ত আয়োজনের মাধ্যমে সবাইকে চমকে দেবে এবং এ ধারাবাহিকতা ক্রমেই এগিয়ে যাবে।”
রাতের সমাপনীতে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জলের গান’-এর মুগ্ধকর পরিবেশনা উৎসবকে পৌঁছে দেয় আবেগের চূড়ায়।
‘অরণ্যের সুর ~ ফোক ফেস্ট ২.০’ শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং ছিল শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা, লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে সংস্কৃতির বীজ বপনের এক অনন্য উদযাপন।








