অভয়নগরে ভুয়া দর্জি প্রশিক্ষণের জাল, নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের নামে অর্থ বাণিজ্য
কামাল হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি
সাংবাদিক পরিচয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ, কাগজে অফিস, বাস্তবে নেই অস্তিত্ব; সরকারি স্কুলে ‘ক্লাস’ নিয়ে ফি আদায়। যশোরের অভয়নগরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় দর্জি প্রশিক্ষণের নামে একটি সংগঠিত প্রতারণা চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ উঠেছে। “হৃদয় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার” নামে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের নেই কোনো সরকারি নিবন্ধন বা অনুমোদন, অথচ নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ ফি আদায় এবং সনদ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাকির হোসেন হৃদয় নামের এক ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক ও প্রভাবশালী মিডিয়াকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। প্রতিষ্ঠানটির জন্য ব্যবহার করা চেঙ্গুটিয়া বাজার ও নওয়াপাড়া মডেল স্কুল রোডের ঠিকানায় সরেজমিনে গিয়ে কোনো প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের সঙ্গেও কথা বলে এমন কোনো কার্যক্রমের সত্যতা মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঠিকানা দেখিয়েই বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আরও জানা যায়, অভয়নগরের বাইরে বাঘারপাড়া, ফুলতলা, মনিরামপুর, জামিরিয়া ও কেশবপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কক্ষ ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এতে সরকারি সম্পদের অপব্যবহার ও বিদ্যুতের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রভাব খাটাতেন, ফলে তারা আপত্তি তুলতে সাহস পাননি।
অভিযোগের আরেকটি গুরুতর দিক হলো, প্রশিক্ষণ শেষে সনদ দেওয়া হলেও তা কোনো স্বীকৃত বা নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের নয়; বরং অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেই তার নিবন্ধনহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সনদ তৈরি করে বিতরণ করেন। ফলে এসব সনদ কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দাখিল করলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না। এদিকে হৃদয় টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার-এর প্রচারণা লিফলেটে “সরকার কর্তৃক অনুমোদিত” উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ মেলেনি। পোস্টারে মাত্র ১০০ টাকা দিয়ে ভর্তি ফরম ও পাঠ্যসূচি নেওয়া যাবে এবং মাসিক কোনো বেতন নেই, এমন প্রচারণা থাকলেও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করে নিজেকে প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দর্জি প্রশিক্ষণের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নেওয়া হলেও অনেকেই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে পারেননি, পাননি প্রতিশ্রুত সনদ কিংবা টাকা ফেরত। ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ ভয় ও প্রভাবের কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনিচ্ছুক।
অভিযোগের বিষয়ে জাকির হোসেন হৃদয় বলেন, তার প্রতিষ্ঠানের কোনো সরকারি নিবন্ধন নেই এবং দেওয়া ঠিকানাগুলোতে তিনি মাঝে মাঝে বসেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের কক্ষ ব্যবহারের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, আগে ব্যবহার করলেও বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে নওয়াপাড়া প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফ প্রিন্স জানান, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি জানা থাকলেও এর নিবন্ধন রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নন। এবিষয়ে জানার জন্য অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালাউদ্দিন দীপুর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, এতসব অভিযোগের পরও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাব ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণেই অভিযুক্ত ব্যক্তি এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়েছেন। এলাকাবাসী দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, প্রশিক্ষণের নামে এ ধরনের প্রতারণা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, মানুষের আস্থা ও ভবিষ্যৎকেও হুমকির মুখে ফেলছে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ চক্র আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








