শিরোনাম
সিরাজগঞ্জের তাড়াশে দেশীগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেবে হাফিজুর রহমানের জীবন বৃত্তান্ত ও রাজনৈতিক পরিচিতি তানোর-মোহনপুর সড়ক এখন মরণফাঁদ খানাখন্দে বেহাল দশা, বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা—ঝুঁকি নিয়ে চলাচল হাজারো মানুষের গুইমারায় সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সহায়তা সামগ্রী বিতরণ সেলফ-সেন্সরশিপ: সাংবাদিক চুপ থাকলে ক্ষতিটা কার? নাসিরনগরে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল পাঁচ বছরের মধ্যে শতভাগ যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিতের লক্ষ্য: যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সোনারগাঁয়ে পুলিশের বিশেষ অভিযান, ইয়াবাসহ আটক ১২ সোনারগাঁওয়ে যুবকের মরদেহ উদ্ধার, বুকে ধারালো অস্ত্রের আঘাত আগের রাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ ছিলেন হাবিবুল্লাহ গুইমারায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে মতবিনিময় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ও প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ সোনারগাঁও র‍্যাবের পোশাক- ওয়াকিটকি সহ দুইজন ভুয়া সদস্য আটক সলঙ্গায় মাদ্রাসার শিক্ষক আনিসুর রহমান’র বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন

সেলফ-সেন্সরশিপ: সাংবাদিক চুপ থাকলে ক্ষতিটা কার?

প্রতিবেদকের নাম / ১৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 

পলাশ পাল, সাংবাদিক

সাংবাদিকের হাতে শুধু কলম, নোটবুক কিংবা ক্যামেরা থাকে না; থাকে মানুষের প্রশ্ন, প্রত্যাশা, ক্ষোভ ও অধিকারকে দৃশ্যমান করার দায়িত্ব। সাংবাদিকতা তাই নিছক একটি পেশা নয়—এটি সমাজের কাছে সত্য তুলে ধরা এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের পথে যখন ভয়, চাপ ও অনিশ্চয়তা সাংবাদিকের চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন জন্ম নেয় এক নীরব সংকট—‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণ।

একজন সাংবাদিকের হাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা অনুসন্ধানের উপাদান রয়েছে। তথ্য যাচাইও হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে মনে প্রশ্ন জাগে—এটি প্রকাশ করলে কারও অসন্তোষ তৈরি হবে কি না, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হবে কি না, চাকরি বা পেশাগত ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে কি না, কিংবা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না। শেষ পর্যন্ত যদি ভয়ই সিদ্ধান্ত নেয় কোন তথ্য প্রকাশিত হবে আর কোনটি হবে না, তাহলে সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা—জনস্বার্থ—দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবে সেলফ-সেন্সরশিপ নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। সাংবাদিকের দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন সংযম আর ভয়ের কারণে সত্য গোপন করা এক বিষয় নয়।

অযাচাইকৃত তথ্য প্রকাশ না করা, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানো, শিশু বা সংবেদনশীল বিষয়ে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা কিংবা আইন ও পেশাগত নীতিমালা অনুসরণ করা—এসব সাংবাদিকতার অপরিহার্য দায়িত্ব। এগুলোকে সেলফ-সেন্সরশিপ বলা যায় না।

সেলফ-সেন্সরশিপের সংকট তখনই প্রকট হয়, যখন তথ্য প্রকাশ না করার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় ভয়—প্রমাণের ঘাটতি নয়; সাংবাদিকতার নীতি নয়, বরং সম্ভাব্য প্রতিশোধের আশঙ্কা; জনস্বার্থ নয়, বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা চাকরি হারানোর আতঙ্ক।

সাংবাদিক নীরব হলে নীরব হয় সমাজও

একজন সাংবাদিক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করলে হয়তো একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় না। কিন্তু এর প্রভাব অনেক সময় একটি সংবাদে সীমাবদ্ধ থাকে না। কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড কিংবা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যদি যথাযথভাবে সামনে না আসে, তাহলে জনগণ সেই বিষয়ে জানার এবং প্রশ্ন তোলার সুযোগ হারাতে পারে।

তথ্যের ঘাটতি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। নাগরিক যদি প্রয়োজনীয় তথ্য না পান, তাহলে তিনি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে যথাযথভাবে মতামত গঠন করতে পারেন না। গণতান্ত্রিক সমাজে তাই স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশের বিষয় নয়; এটি তথ্যভিত্তিক নাগরিক অংশগ্রহণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে এ সংকট আরও স্পষ্ট হতে পারে। একজন উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের সাংবাদিক প্রতিদিন প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও স্থানীয় উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। একই এলাকায় বসবাস এবং কাজ করার কারণে স্থানীয় সাংবাদিকের ওপর সামাজিক ও পেশাগত চাপও তৈরি হতে পারে। ফলে তিনি যদি কোনো বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে দ্বিধাবোধ করেন, তার প্রভাব সরাসরি স্থানীয় জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির ওপর পড়তে পারে।

ভয়কে স্বাভাবিক করে তোলা বিপজ্জনক

সেলফ-সেন্সরশিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এটি সবসময় প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তৈরি হয় না। অনেক সময় কোনো সরাসরি নির্দেশ ছাড়াই সাংবাদিক নিজেই অনুমান করতে থাকেন, কোন বিষয় লিখলে সমস্যা হতে পারে। ধীরে ধীরে সেই আশঙ্কা তার পেশাগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

এক পর্যায়ে তিনি হয়তো এমন বিষয় এড়িয়ে যেতে শুরু করেন, যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেদনের ভাষা এতটাই নরম হয়ে যায় যে মূল সমস্যাটিই আড়ালে পড়ে যায়। আবার কখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ পড়ে যায় শুধু সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে।

এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকলে ভয় সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ বলে মনে হতে শুরু করে। অথচ ভয়কে পেশাগত সংস্কৃতির স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে মেনে নেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার সময় আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—স্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়।

সাংবাদিকের স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষতা, ভারসাম্য, উৎসের গোপনীয়তা রক্ষা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ভুল হলে তা সংশোধনের নৈতিক দায়িত্ব। জনস্বার্থের নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গুজব, যাচাইহীন অভিযোগ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ কোনোভাবেই স্বাধীন সাংবাদিকতার উদাহরণ হতে পারে না।

বরং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই স্বাধীন গণমাধ্যমের ভিত্তি শক্তিশালী করে। একজন সাংবাদিকের শক্তি হওয়া উচিত তথ্য, দলিল, যাচাই এবং যুক্তি—ভয় দেখানো, অতিরঞ্জন কিংবা পক্ষপাত নয়।

গণমাধ্যমকে প্রতিপক্ষ নয়, জবাবদিহির অংশ হিসেবে দেখতে হবে

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের প্রশ্নকে শত্রুতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে জবাবদিহির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কোনো প্রতিবেদন ভুল হলে তথ্য ও যুক্তি দিয়ে তার প্রতিবাদ করা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের বক্তব্য দিতে পারে। প্রয়োজনে আইনগত প্রতিকারও রয়েছে।

কিন্তু প্রশ্নের জবাব না দিয়ে সাংবাদিককে ভয় দেখানো, হুমকি দেওয়া, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা পেশাগতভাবে চাপে রাখার সংস্কৃতি তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু সংবাদমাধ্যম নয়—সমাজের তথ্যপ্রবাহও।

একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান মানে এমন প্রতিষ্ঠান, যারা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে পারে। আর স্বাধীন সাংবাদিকতা সেই প্রশ্নগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম।

সম্পাদকীয় স্বাধীনতারও প্রয়োজন

সেলফ-সেন্সরশিপের দায় শুধু সাংবাদিকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো, সম্পাদকীয় নীতি, চাকরির নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক চাপ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

একজন সাংবাদিক যদি জানেন যে একটি সত্যনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে তার চাকরি চলে যেতে পারে, তাহলে শুধু তাকে সাহসী হওয়ার পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন একটি পেশাগত পরিবেশ, যেখানে সাংবাদিক তথ্য যাচাই করে জনস্বার্থের সংবাদ প্রকাশ করতে পারেন এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত পেশাগত নীতির ভিত্তিতে নেওয়া হয়।

সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাই শুধু সাংবাদিকদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি জনগণের

সাংবাদিক চুপ থাকলে প্রশ্নটি শুধু এই নয়—একজন সাংবাদিক কী হারালেন? আরও বড় প্রশ্ন হলো—জনগণ কী হারাল?

একটি গুরুত্বপূর্ণ অনিয়মের খবর হয়তো প্রকাশ হলো না। একটি ভুক্তভোগী মানুষের বক্তব্য হয়তো জনসমক্ষে এল না। একটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন উঠল না। একটি পরিবেশগত ক্ষতির তথ্য হয়তো আলোচনায় এলো না। এসব ছোট ছোট নীরবতা একসময় বড় ধরনের তথ্যশূন্যতা তৈরি করতে পারে।

তাই সেলফ-সেন্সরশিপকে শুধু সাংবাদিকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনগণের জানার অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং একটি সমাজের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি।

সাংবাদিকের কলম স্বাধীন থাকবে—এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি তথ্য যাচাই ছাড়াই প্রকাশ করতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, সাংবাদিক যেন সত্যতা যাচাই করে জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্তটি ভয় বা অযাচিত চাপের কাছে সমর্পণ করতে বাধ্য না হন।

কারণ একজন সাংবাদিকের নীরবতা কখনো কখনো শুধু একটি সংবাদকে থামিয়ে দেয় না; থামিয়ে দিতে পারে একটি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন, একটি জনস্বার্থের বিতর্ক কিংবা জবাবদিহির একটি সুযোগ।

সাংবাদিকতা হোক সত্য, দায়িত্বশীলতা ও জনস্বার্থের পক্ষে। ভয় নয়—তথ্য, যুক্তি ও নৈতিকতাই হোক সাংবাদিকের সিদ্ধান্তের ভিত্তি। আর সংবাদমাধ্যমকে এমন জায়গা করে তুলতে হবে, যেখানে সত্য প্রকাশের আগে সাংবাদিককে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে নয়, বরং তথ্যের সত্যতা ও মানুষের স্বার্থ নিয়ে ভাবতে হয়।

সাংবাদিক চুপ থাকলে ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত কার?—ক্ষতিটা পুরো সমাজের।

Share this news as a Photo Card


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের আরও খবর
30 September 2026

সেলফ-সেন্সরশিপ: সাংবাদিক চুপ থাকলে ক্ষতিটা কার?

www.dainikkagoj.com
30 September 2026

সেলফ-সেন্সরশিপ: সাংবাদিক চুপ থাকলে ক্ষতিটা কার?

www.dainikkagoj.com